‘প্রধানমন্ত্রীর ওপর অন্ধ বিশ্বাস রাখতে হবে কেন?’ ইসি নিয়োগ আইন নিয়ে কেন্দ্রের সওয়াল উড়িয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) এবং নির্বাচন কমিশনারদের (EC) নিয়োগ প্রক্রিয়া কেবল স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং সেই স্বাধীনতা সাধারণ মানুষের চোখে দৃশ্যমান হওয়াও সমানভাবে জরুরি ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে বৃহস্পতিবার অত্যন্ত জোরালো মন্তব্য করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে আদালত সরাসরি এবং তীব্র প্রশ্ন তুলেছে যে, নতুন আইন প্রণয়নের সময় নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটি বা সিলেকশন প্যানেল থেকে দেশের প্রধান বিচারপতি (CJI)-কে সুকৌশলে কেন বাদ দেওয়া হল? এই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার ওপর দীর্ঘ সওয়াল-জবাব শেষে সুপ্রিম কোর্ট তার রায় বর্তমানে সংরক্ষিত রেখেছে।
বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছে যে, সিবিআই ডিরেক্টর বা লোকপালের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাছাই কমিটিতে প্রধান বিচারপতি বা তাঁর প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকেন। তাহলে ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি তথা নির্বাচন কমিশনের মতো সুমহান প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাঁকে প্যানেল থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার যৌক্তিক আইনি যৌক্তিকতা বা যুক্তি কী থাকতে পারে? উল্লেখ্য, এই মামলার শুনানিপর্বে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারের পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি আরও বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য একটি সাংবিধানিক বেঞ্চে স্থানান্তরিত করার বিশেষ আবেদন জানানো হয়েছিল। সেই আবেদনের ওপর উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ সওয়াল-জবাব সমাপ্ত হওয়ার পরই আদালত তাদের রায়দান স্থগিত রাখে।
বর্তমান প্রসঙ্গ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইনটিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেগুলির ওপর বর্তমানে শুনানি চলছে। ওই বিশেষ আইনটির বিধান অনুযায়ী, দেশের রাষ্ট্রপতি মূলত প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং বাকি নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ করে থাকেন একটি তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের নির্বাচনী কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে। এই সংবিধিবদ্ধ কমিটিতে পদাধিকার বলে বর্তমানে অন্তর্ভূক্ত রয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলের নেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি মনোনীত তথা রিকমেন্ড করা একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রী।
কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে আইনি লড়াই লড়তে গিয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে সওয়াল করেন যে, আদালতের কখনোই এমন পূর্বধারণা পোষণ করা উচিত নয় যে দেশের প্রধানমন্ত্রী কোনো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী বা পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল, প্রধানমন্ত্রীর পদটি নিজেতেই একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সাধারণ নাগরিকদের এই পদের সুমহান পবিত্রতা ও কার্যকারিতার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা উচিত। তুষার মেহতা আদালতে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় আরও বলেন, “দেশের মানুষকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে। যদি শুরুতেই এমনটা ধরে নেওয়া হয় যে নির্বাহী বিভাগের প্রতিটি সিদ্ধান্তই অসৎ উদ্দেশ্যে বা হীন মতলবে নেওয়া হচ্ছে, তবে তো ঠিক একই যুক্তির টানে মন্ত্রিসভার যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রেও বাইরের নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মতামত নেওয়া বা বাধ্যতামূলক করা উচিত।”
তিনি আরও যুক্তি দেন যে, দেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পার্লামেন্টে শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে বলেই তারা সরাসরি কোনো সংবিধানবিরোধী বা বেআইনি কাজ করবেন— এমন নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা কোনোভাবেই সঠিক বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তবে সরকারের এই যুক্তির জবাবে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় যে, তারা কোনোভাবেই দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সততা, নিষ্ঠা বা ব্যক্তিগত সুনাম নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন তুলছে না। আদালতের মূল উদ্বেগ এবং আইনি পর্যালোচনা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা নিয়ে। ঠিক এই প্রসঙ্গেই বেঞ্চ আরও জানতে চায় যে, বর্তমানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় মোট কতজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। একই সঙ্গে আদালত অতীতের বিভিন্ন নজির স্মরণ করিয়ে দিয়ে সতর্ক করে দেয় যে, অতীতেও সরকারকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যাতে কোনো ধরনের অপরাধমূলক অভিযোগ বা ক্রিমিনাল ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্বে নিয়োগ করা না হয়।