জমি-বাড়ি নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে চলা ঝামেলার হবে চিরতরে অবসান! রাজধানী দিল্লিতে আসছে যুগান্তকারী ল্যান্ড রেকর্ড বিল

দিল্লির আবাসন ও রিয়েল এস্টেট ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনতে চলেছে রাজ্য সরকার। এবার থেকে দিল্লির যেকোনো গ্রামের বাড়ি, কৃষিজমি থেকে শুরু করে বহুতল ফ্ল্যাট এবং বাণিজ্যিক ভবন—প্রতিটি সম্পত্তির জন্য তৈরি হতে চলেছে একটি সম্পূর্ণ অনন্য ডিজিটাল পরিচয়। সাধারণ মানুষের জমিজমা ও সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ করতে দিল্লি সরকার খুব শীঘ্রই ‘দিল্লি ল্যান্ড রেকর্ডস বিল, ২০২৬’ (Delhi Land Records Bill, 2026) বিধানসভায় পেশ করতে চলেছে। এই নতুন প্রস্তাবিত আইনের অধীনে রাজধানীর সমস্ত সম্পত্তি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সার্ভে করা হবে এবং একটি একক সাধারণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সমস্ত রেকর্ড সুরক্ষিত রাখা হবে। যাকে রাজ্য সরকার মূলত ‘প্রপার্টি আধার কার্ড’ (Property Aadhaar Card) হিসেবে অভিহিত করছে, যার মাধ্যমে প্রতিটি সম্পত্তিকে একটি স্বতন্ত্র ইউনিক প্রপার্টি আইডি প্রদান করা হবে।

দিল্লি সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সুদূরপ্রসারী উদ্যোগটি শুধুমাত্র গ্রামাঞ্চল নয়, বরং সমগ্র শহুরে দিল্লির ওপরও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। বিশেষ করে বহুতল আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে প্রতিটি আলাদা তলার জন্য একটি পৃথক এবং স্বতন্ত্র ডিজিটাল রেকর্ড প্রস্তুত করা হবে। এই প্রসঙ্গে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই আধুনিক ব্যবস্থা রাজধানীর প্রতিটি সম্পত্তিকে একটি নির্ভরযোগ্য এবং সুরক্ষিত ডিজিটাল পরিচয় প্রদান করবে। তিনি তাঁর বক্তব্যে আরও যোগ করেন, “ঠিক যেভাবে দেশের প্রতিটি নাগরিককে আধার কার্ড একটি স্বতন্ত্র এবং নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিচয় দিয়েছে, ঠিক তেমনি এবার থেকে দিল্লির প্রতিটি সম্পত্তিকে একটি সুরক্ষিত ও প্রমাণীকৃত ডিজিটাল পরিচয় দেওয়া হবে।” বর্তমানে মন্ত্রীদের একটি উচ্চপর্যায়ের গোষ্ঠীর পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর বিলটি চূড়ান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এমনকি এই প্রস্তাবিত যুগান্তকারী আইনটি নিয়ে আলোচনার জন্য খুব শীঘ্রই দিল্লি বিধানসভার একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকারও পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

প্রস্তাবিত এই নতুন আইনে কী কী বিশেষ সুযোগ-সুবিধা এবং রূপরেখা রাখা হয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী, অত্যাধুনিক ড্রোন-ভিত্তিক সমীক্ষা এবং উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে সমগ্র দিল্লির জমি ও সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত করা হবে। এই প্রযুক্তিগত ও কারিগরি কাজের জন্য সরাসরি সহায়তা প্রদান করবে ‘সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ (Survey of India)। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত সরকারি বিভাগ এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার মাধ্যমে যে সমস্ত রেকর্ড রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, সেগুলিকে একত্রিত করে একটিমাত্র একক প্ল্যাটফর্মে সংকলিত করা হবে। গ্রামীণ দিল্লির ক্ষেত্রে গ্রামভিত্তিক সুনির্দিষ্ট ম্যাপিং করা হবে এবং পরবর্তীতে এই বিশাল কার্যক্রম সুপরিকল্পিতভাবে শহরাঞ্চলের আবাসিক, বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য সমস্ত শ্রেণির সম্পত্তিতেও সম্প্রসারিত করা হবে। সমীক্ষা এবং নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়া আরও মসৃণ করতে সম্প্রতি গ্রাম প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে দিল্লির মোট ৩০টি গ্রামীণ গ্রামকে কেন্দ্রের নিজস্ব ‘স্বামিত্ব’ (SVAMITVA) প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সরকারি তথ্য বলছে, এই ৩০টি নির্দিষ্ট গ্রামে ড্রোন সার্ভের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে সংশ্লিষ্ট নথি সংকলন ও ‘স্বামিত্ব সম্পত্তি কার্ড’ তৈরির কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে। পাইলট পর্যায়ের এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই পরবর্তীতে রাজধানীর বাকি অংশে এই সম্পত্তি-রেকর্ড ব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সুসংহত ডিজিটাল রেকর্ডগুলি অদূর ভবিষ্যতে সাধারণ বাসিন্দাদের আইনি মালিকানা প্রমাণ, পারিবারিক উত্তরাধিকার নির্ধারণ, সহজে ব্যাঙ্ক ঋণ পাওয়া এবং বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলিতে অবিশ্বাস্য রকমের সাহায্য করবে। এর পাশাপাশি, আদালত এবং রাজস্ব কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা সম্পত্তি সংক্রান্ত জটিল বিরোধগুলি দ্রুত নিষ্পত্তি করতেও এই ডিজিটাল ডেটা অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা এই প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত কয়েক দশক ধরে রাজধানীতে একটি সুশৃঙ্খল এবং আধুনিক ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থার চরম অভাব ছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষকে আইনি মালিকানা প্রমাণ করতে গিয়ে, সম্পত্তি লেনদেন করতে গিয়ে, উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পেতে গিয়ে, ঋণ নিতে গিয়ে, মিউনিসিপ্যাল প্ল্যান অনুমোদন করাতে গিয়ে কিংবা আদালতে চলা মামলাগুলির নিষ্পত্তি করতে গিয়ে চরম দুর্দশার মুখোমুখি হতে হতো।” তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, সরকারের এই নির্ভুল প্রমাণীকৃত ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থা ভবিষ্যতে যেকোনো সম্পত্তির সঠিক সীমানা নির্ধারণ এবং প্রকৃত মালিকানা সংক্রান্ত যাবতীয় অস্পষ্টতা ও জালিয়াতি চিরতরে দূর করতে সক্ষম হবে।