২২ লক্ষ পড়ুয়ার স্বপ্ন ভাঙছে এক পলকে! নিট প্রশ্নফাঁস নিয়ে রাজ্যসভায় কেঁদে ফেললেন বিজেপি সাংসদ রাঘব চাড্ডা?

দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থায় চরম স্বচ্ছতা আনতে এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য অপরাধ চিরতরে নির্মূল করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘পাবলিক এক্সামিনেশন (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) সংশোধনী বিল, ২০২৬’ সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় সফলভাবে পাশ হওয়ার ঠিক প্রাক্কালে নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ড নিয়ে অত্যন্ত জোরালো ও আবেগঘন বক্তব্য রাখলেন বিশিষ্ট বিজেপি সাংসদ রাঘব চাড্ডা। এর আগে জনবহুল লোকসভাতেও এই বিলটি বিপুল ভোটে পাশ হয়েছিল। এদিনের সংসদীয় অধিবেশনে এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে রাঘব চাড্ডা দেশের কোটি কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সরকারের সদিচ্ছার কথা দৃঢ় কণ্ঠে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ভারতের ছাত্রছাত্রী ও যুবসমাজ আজ যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, তাতে আমি সম্পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি যে সরকার সর্বান্তঃকরণে তাঁদের আকুতি শুনেছে, দ্রুত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং নিজেদের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করেছে।”
সাম্প্রতিককালে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের নজিরবিহীন ঘটনায় গোটা দেশের পরীক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ রাস্তায় নেমে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল। সেই সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগের জোরালো দাবিও উঠেছিল। পরবর্তীতে প্রবল রাজনৈতিক ও ছাত্র আন্দোলনের মুখে পড়ে তিনি তাঁর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। এদিনের সংসদ ভবনে দাঁড়িয়ে রাঘব চাড্ডা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো এই গভীর সামাজিক সমস্যার কেবল সাময়িক ওষুধ দিলে চলবে না, এর স্থায়ী ও কড়া সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। নিজের বক্তব্যে তৎকালীন বিভীষিকাময় পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “দেশের প্রায় ২২ লক্ষ ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন একটানা ১৮ ঘণ্টা করে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মাত্র ৩ ঘণ্টার একটি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, একটি মাত্র ক্যামেরা ফোন, একটি ছোট হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা কিংবা মাঝরাতে টেলিগ্রামে ছড়িয়ে পড়া একটি পিডিএফ ফাইলের জাদুতে নিমিষেই সমস্ত প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায় এবং লক্ষ লক্ষ তরুণের বছরের পর বছরের মেধা ও পরিশ্রম জলের মতো ধুলোয় মিশে যায়।”
তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় আরও বলেন যে, শরীরের মারণ রোগ ক্যানসারের চিকিৎসা যেমন কোনো সাধারণ প্যারাসিটামল ওষুধ দিয়ে সম্ভব নয়, তেমনই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জটিল ব্যাধির স্থায়ী সমাধান কেবল ফাঁকা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে কখনোই করা যাবে না। এর জন্য প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার আনা জরুরি। আর এই নতুন সংশোধনী বিলটি পাশ হওয়ার মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে প্রথমবার নিখুঁত প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করার একটি শক্তপোক্ত আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। নিট পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দিয়ে রাঘব চাড্ডা বলেন যে, তাঁদের মনে জমা হওয়া ক্ষোভ ও মনের কষ্ট সম্পূর্ণ আইনি ও নৈতিকভাবে শতভাগ ন্যায্য। তিনি দাবি করেন যে, দেশের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের এই না পাওয়ার বেদনা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কেবল দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নন, বরং একজন পরিবারের অভিভাবকের মতো পরম যত্নে ও উদ্বেগের সঙ্গে শুনেছেন। এরপরই কেন্দ্রীয় সরকার একযোগে একাধিক তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি আরও জানান যে, এই কেলেঙ্কারির তদন্ত শুরু হওয়ার মাত্র ৭৫ দিনের মধ্যেই দেশের দ্রুত বিচার আদালতে পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট জমা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি, সামগ্রিক ব্যর্থতার দায় এড়াতে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির বা এনটিএ-র (NTA) অন্তত ৪৭ জন দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিককে কঠোরহস্তে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রকের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সচিবকেও অবিলম্বে বদলি করা হয়েছে। নৈতিক দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং বিগত ছাত্র আন্দোলনের সময় পুণ্যার্থী বা আন্দোলনকারী তরুণদের বিরুদ্ধে পুলিশি হয়রানি ও যে সমস্ত মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সেই সমস্ত মামলাও সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
শুধু তাই নয়, এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হওয়া মৃত ছাত্রছাত্রীদের শোকার্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ, ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার নিরাপত্তা বহুগুণ সুনির্ধারিত করা এবং আগামী দিনে প্রথাগত ওএমআর (OMR) শিট ব্যবস্থার পরিবর্তে সম্পূর্ণ কম্পিউটারভিত্তিক নিখুঁত পদ্ধতিতে নিট পরীক্ষা আয়োজনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথাও সবিস্তারে তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি, দেশের সমগ্র পাবলিক পরীক্ষার সার্বিক স্বচ্ছতা ও নিখুঁত মান বজায় রাখতে আরও বড় পরিসরে আমূল সংস্কার সাধনের উদ্দেশ্যে একটি অত্যন্ত ক্ষমতাশালী উচ্চপর্যায়ের টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে, যেখানে দেশের প্রথম সারির তথ্যপ্রযুক্তি ব্যক্তিত্ব ও বিশেষজ্ঞ নন্দন নিলেকানির মতো স্বনামধন্য প্রতিভাদেরও সফলভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।