মর্গে দেহ রাখতে গেলেও দিতে হবে উৎকোচ! উত্তরবঙ্গ মেডিকেলে কাটমানির দাবিতে চাঞ্চল্য, ক্ষোভে ফুটছে রোগীর পরিবার

রাজ্যে প্রশাসনিক রদবদল এবং তোলাবাজি-কাটমানির বিরুদ্ধে শীর্ষ স্তরের কঠোর বার্তার পরেও উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ছবিটা যে বিন্দুমাত্র বদলায়নি, তার আরও এক নির্মম প্রমাণ সামনে এল। সম্প্রতি খোদ হাসপাতালের মর্গে মৃতদেহ নিরাপদে সংরক্ষণ ও রাখার ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে কাটমানি চাওয়ার এক অত্যন্ত গুরুতর ও লজ্জাজনক অভিযোগ উঠেছে। এক মর্মান্তিক পথদুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তির শোকস্তব্ধ পরিবার অভিযোগ করেছেন যে, ময়নাতদন্তের নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ায় রাতে দেহটি মর্গে সুরক্ষিতভাবে রাখার জন্য হাসপাতালেরই এক অসাধু কর্মী তাঁদের কাছে সটান দু’হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরবর্তীতে পরিবারটির পক্ষ থেকে পুলিশে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হলে ওই কর্মী পিছু হটতে বাধ্য হন। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় গোটা হাসপাতাল চত্বরে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে এবং অভিযুক্ত কর্মীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, অভিযুক্তকে মেডিকেলের অভ্যন্তরীণ তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তলব করা হয়েছে।

হাসপাতাল ও স্থানীয় পরিবার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার জলপাইগুড়ির কাজীপাড়ার তালমাহাট সংলগ্ন ধাপাচিলা গ্রামের বাসিন্দা বীরেন রায় (৫০) ফাটাপুকুর এলাকায় একটি মর্মান্তিক বাইক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে প্রাণ হারান। সকালে দুর্ঘটনার দুঃসংবাদ পেয়ে তাঁর স্বজনেরা দ্রুত তাঁকে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে আসেন, কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। নিয়ম অনুযায়ী ময়নাতদন্তের নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার কারণে মঙ্গলবার রাতে মৃতদেহটি মর্গের হিমঘরে রাখার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু অভিযোগ ওঠে যে, বিকেল পাঁচটা নাগাদ দেহটি মর্গে রাখতে গেলে সেখানকার এক কর্মরত কর্মী মৃতের দরিদ্র স্বজনদের কাছে জোর করে দু’হাজার টাকা উৎকোচ দাবি করেন।

মৃতের এক প্রতিবেশী ফুলেশ্বর রায় এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “আমরা অত্যন্ত গরিব মানুষ, সামান্য রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাই। সরকারি হাসপাতালে সরকারি জায়গায় মৃতদেহ রাখতে কেন মিছিমিছি টাকা দেব? যখন আমরা ওই কর্মীর অনৈতিক দাবির প্রতিবাদ জানিয়ে টাকা দিতে অস্বীকার করি, তখন সে ক্ষিপ্ত হয়ে মর্গের ঘরে তালা মেরে সেখান থেকে চলে যায়। এরপর আমরা যখন কোনো উপায় না দেখে মৃতদেহটি নিয়ে সরাসরি পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ জানানোর উদ্যোগ নিই, তখন সেই কর্মী ভয়ে তড়িঘড়ি ফিরে এসে তালা খুলে দেহটি মর্গে ঢুকিয়ে দেয়।” বুধবার সকালে যখন পরিবারটি এই গোটা ঘটনা নিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে যায়, তখন অভিযুক্ত কর্মীকে আর নাগালের মধ্যে পাওয়া যায়নি এবং পরবর্তীতে অন্য কেউ আর টাকা দাবি করার সাহস দেখায়নি। মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে মৃতের শোকস্তব্ধ ছেলে বিকাশ রায় জানান, জীবনের চরম শোকের মুহূর্তে হাসপাতালের কর্মচারীদের এই ধরনের পৈশাচিক মানসিকতা ও লোভ তাঁদের পরিবারকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।

ঘটনাটির তীব্র নিন্দা করে মেডিকেলেরই এক কর্মরত নার্সিং স্টাফ (যিনি নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করতে চাননি) আক্ষেপের সুরে জানান, “এখানে মৃতদেহ রাখা থেকে শুরু করে ময়নাতদন্তের পর শরীর সেলাই করার নাম করে হাসপাতালের একশ্রেণির অসাধু কর্মী নিয়মিত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করে। মৃতের পরিবার সেই মুহূর্তে মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়ে যে বাধ্য হয়ে অনেক সময় তাঁরা টাকা দিয়ে দেন। এই দুর্নীতির অসাধু চক্র অবিলম্বে চিরতরে বন্ধ করা দরকার।” উল্লেখ্য, ঠিক এর দুই সপ্তাহ আগেও এই একই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বর থেকে এমন বহু গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছিল, যে সময় তৎকালীন প্রিন্সিপাল সঞ্জয় মল্লিক চারজন অভিযুক্ত কর্মীকে শোকজ পর্যন্ত করেছিলেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এত কড়া সতর্কবার্তা এবং প্রশাসনিক রদবদল হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল, তা নিয়ে খোদ চিকিৎসাকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়ে গিয়েছে।

এই লজ্জাজনক ঘটনায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন মেডিকেলের নতুন সুপার কৌশিক ঈশোর। তিনি গণমাধ্যমের সামনে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, “এই পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। যেকোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের কাছে টাকা দাবি করা বা কাটমানি নেওয়া একটি চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর সঙ্গে যদি হাসপাতালের কোনো সরকারি কর্মী বা স্থায়ী কর্মচারীও যুক্ত থাকেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবেই আইনানুগ কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গোটা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে— এতদিন এই মেডিকেলে যা অনিয়ম ঘটেছে, তা ভবিষ্যতে আর কোনোভাবেই হতে দেওয়া হবে না।”