মোংলার জেলের নিখোঁজ রহস্যে চাঞ্চল্যকর মোড়! কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিয়ে হাই কোর্টের তলব

মোংলার সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার নিখোঁজ জেলে মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত দুই বছরের মধ্যে এটিই গুমের প্রথম ঘটনা। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জানানো হয়েছে, জোরপূর্বক গুমের শিকার হওয়ার আগে মি. শেখকে সর্বশেষ কোস্টগার্ডের হেফাজতে দেখা গিয়েছিল। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোস্টগার্ড জানিয়েছে, তারা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে হাইকোর্টের কোনো আদেশ বা নোটিশ পায়নি। নোটিশ পাওয়া সাপেক্ষে তারা প্রয়োজনীয় জবাব ও তথ্য উপস্থাপন করবে এবং আদালতের নির্দেশনা পুরোপুরি প্রতিপালন করবে বলে জানানো হয়েছে। হাইকোর্টের আদেশ পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মিরাজ শেখকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন। অন্যদিকে, নিখোঁজ মি. শেখের বোন লিজা ইসলাম দাবি করেছেন যে ঘটনার পর থেকে তাদের পরিবার এখনও নানা ধরনের হুমকির শিকার হচ্ছে এবং তাদের ওপর নানা নির্যাতন চালানো হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে প্রকাশ, একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান অনুযায়ী গত ১০ই এপ্রিল রাতে মোংলার সুন্দরবন সংলগ্ন জয়মনির ঘোল এলাকা থেকে কোস্টগার্ডের সদস্যরা মিরাজ শেখকে স্পিডবোটে করে তুলে নিয়ে যান। পরদিন তার পরিবার মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ডের কার্যালয়ে গেলে প্রথমে জানানো হয় যে তিনি একটি অভিযানে আছেন এবং বিকেলে ফিরবেন। কিন্তু বিকেলে আবার গেলে জানানো হয় যে মিরাজ শেখ সেখানে কখনোই ছিলেন না। মিরাজের বোন লিজা ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আল আমিনের চায়ের দোকানে বসে থাকার সময় কোস্টগার্ডের দুই সদস্য এবং গ্রামের এক মাঝি সেখানে এসে তাকে ধরে মারধর শুরু করে এবং হারবাড়িয়া কোস্টগার্ডের পন্টুনে নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা পন্টুনের বাইরে থেকে তার আর্তনাদ শুনতে পান এবং পরবর্তীতে কোস্টগার্ডের একটি স্পিডবোটে করে তাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়। মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন হারবাড়িয়া স্টেশন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রথমে আটকের কথা স্বীকার করা হলেও পরে অস্বীকার করা হয়। এমনকি মিরাজের সন্ধান চেয়ে কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করা হলেও কোনো সদুত্তর মেলেনি।
এই নিখোঁজের ঘটনার পাশাপাশি কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা ও মিথ্যা মামলার অভিযোগও উঠেছে। মিরাজের সন্ধান চেয়ে মানববন্ধন ও কোস্টগার্ডের কাছে অনুরোধ করতে গেলে তার স্ত্রী, বোন ও মাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। পরবর্তীতে কোস্টগার্ডের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং মিরাজের স্ত্রী, বোন ও মা প্রায় ২৭ দিন কারাগারে কাটিয়ে গত ৯ই জুলাই জামিনে মুক্ত হন। এরপর বাধ্য হয়ে মিরাজ শেখের সন্ধান চেয়ে তার পরিবার হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করে। সেই আবেদনের প্রাথমিক শুনানি গ্রহণ করে বিচারপতিদের ডিভিশন বেঞ্চ মিরাজ শেখ কোথায় এবং কী অবস্থায় আছেন, তা খুঁজে বের করে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার না হলে এই ধরনের সংস্কৃতি বন্ধ করা অসম্ভব। নতুন সরকারের উচিত অবিলম্বে গুম প্রতিরোধে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।