প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে কড়া আইন যথেষ্ট নয়! কেন্দ্রকে তোপ দেগে ৫ দফা বিকল্প দাবি তুলল ককরোচ জনতা পার্টি

পরীক্ষা হওয়ার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার মতো মারাত্মক ব্যাধি রোধ করতে সম্প্রতি লোকসভায় পাস হয়েছে ‘পাবলিক এগজামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ বা অ্যান্টি-পেপার লিক বিল (Anti-Paper Leak Bill)। কিন্তু কেন্দ্র সরকারের তৈরি এই নতুন আইন ও আইনি সংস্কার নিয়ে অত্যন্ত তীব্র প্রশ্ন তুলে দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)। দলের স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য, এই আইনে কেবল পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পর অপরাধীদের কড়া সাজা দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে গভীর প্রশাসনিক গলদের কারণে বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে, তা মূল থেকে উপড়ে ফেলার বা প্রতিরোধ করার মতো দূরদর্শী কোনো চিন্তাভাবনা এই নতুন বিলে রাখা হয়নি।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি দেশজুড়ে আলোচিত ‘নিট-ইউজি’ (NEET-UG) কেলেঙ্কারির জেরে তীব্র রাজনৈতিক জলঘোলা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রবল জনরোষ ও বিতর্কের জেরে গত সপ্তাহেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এর পরেই তড়িঘড়ি লোকসভায় এই প্রশ্ন ফাঁস বিরোধী সংশোধনী বিল পাস করায় নরেন্দ্র মোদী সরকার। যেখানে অপরাধীদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক জরিমানার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।

সরকারের এই নীতির তীব্র বিরোধিতা করে সম্প্রতি ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন সিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা। তিনি সরাসরি কেন্দ্রকে তোপ দেগে বলেন, “আপনারা সবসময় প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাওয়ার পরের ঘটনাগুলো নিয়ে কথা বলছেন! ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট তৈরি করা, কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি বা মোটা অঙ্কের জরিমানার ভয় দেখানোর কথা বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস যাতে প্রথম থেকেই আটকানো যায় এবং প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়, তার জন্য সরকার সুনির্দিষ্ট কী পদক্ষেপ করছে, তা নিয়ে বিলে একটা শব্দও নেই।”

প্রশ্ন ফাঁস চিরতরে রুখতে সিজেপির তরফে কেন্দ্রকে অবিলম্বে বেশ কিছু নির্দিষ্ট ও কার্যকরী পদক্ষেপ করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। আশুতোষ রাঙ্কার মতে, কেবল কঠোর আইন এনে কাজের কাজ কিচ্ছু হবে না, নজর দিতে হবে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতায়। এই মর্মে তিনি ৫ দফার একটি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেছেন—
১. এনটিএ-র (NTA) প্রশাসনিক কাঠামো ও সামগ্রিক পরিচালন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে।
২. পরীক্ষার নির্দিষ্ট সূচি, পরীক্ষার ক্যালেন্ডার এবং সিলেবাস সংক্রান্ত সমস্ত তথ্যে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. যে সমস্ত থার্ড পার্টি ভেন্ডর বা বেসরকারি সংস্থাকে পরীক্ষার গুরুদায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তাদের উপর সর্বক্ষণ কড়া নজরদারি চালাতে হবে। একবার কোনো ভেন্ডর ব্ল্যাকলিস্টেড (Blacklisted) হলে, তারা যাতে ঘুরপথে ফের সিস্টেমের ভেতরে ঢুকে পড়ার সুযোগ না পায়, তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
৪. জালিয়াতি ও দুর্নীতি রুখতে ফিজিক্যাল এবং ডিজিটাল—উভয় ধরনের ব্যবস্থারই নিয়মিত থার্ড-পার্টি অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৫. ছাত্রছাত্রী, শিক্ষাবিদ, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ এবং সাইবার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে দীর্ঘমেয়াদী নীতি তৈরি করতে হবে।

সিজেপির মুখপাত্র আরও বলেন, “প্রশ্নফাঁস কীভাবে গোড়া থেকে বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে এবার সরকার খোলা মনে ভাবুক। আমাদের দেওয়া ৫ দফার দাবি সনদের দিকে নজর দিন। তাড়াহুড়ো করে বা খেয়ালখুশি মতো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবেন না। কারণ এটা দেশের লক্ষ লক্ষ মেধাবী ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার বিষয়।”

অন্যদিকে, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপও সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট জানান, প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও সচ্ছল নীতি না থাকলে কেবল জাঁকজমকপূর্ণ আইন তৈরি করে বা আইনি সংস্কার করে কোনো লাভ হবে না। নিজের দাবির পক্ষে একটি বাস্তব উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, নতুন আইন নিয়ে সরকার ও শাসকদল এত ঢাকঢোল পেটানো সত্ত্বেও একটি প্রশ্ন ফাঁস মামলার ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের প্রথম শুনানিই পিছিয়ে দিতে হয়েছে! কারণ, আদালতে সিবিআইয়ের নিজস্ব আইনজীবীই উপস্থিত ছিলেন না।

আইন সংশোধনে ঠিক কী পরিবর্তন আনা হয়েছে?
উল্লেখ্য, সিজেপির নেতৃত্বে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের তীব্র ও লাগাতার প্রতিবাদের মুখে পড়ে গত ২৭ জুলাই লোকসভায় এই সংশোধনী বিল পেশ করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। তাঁর দাবি ছিল, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই সরকার এই কঠোর ব্যবস্থার পথে হেঁটেছে। এমনকি পরীক্ষা সংক্রান্ত মানসিক চাপের কারণে পরীক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যাও নাকি আগের চেয়ে কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।

এই নতুন সংশোধনীতে মূলত ২০২৪ সালের ‘পাবলিক এগজামিনেশনস’ সংক্রান্ত আইনকে আরও অনেক বেশি কড়া করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে চিহ্নিত সমস্ত অপরাধকে ‘নন-বেলেবল’ (জামিন অযোগ্য) এবং ‘কগনিজেবল’ (আমলযোগ্য অপরাধ) বলে গণ্য করা হয়েছে।

ব্যক্তিগত অপরাধের ক্ষেত্রে: আগে অনিয়মের দায়ে সর্বনিম্ন ৩ বছর ও সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেলের বিধান ছিল। এখন সর্বনিম্ন শাস্তি বাড়িয়ে ৫ বছর এবং সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি জরিমানার অঙ্ক ১০ লক্ষ টাকা থেকে একলাফে বাড়িয়ে সরাসরি ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে।

পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থার ক্ষেত্রে: পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্বে থাকা কোনো ভেন্ডর বা সার্ভিস প্রোভাইডার দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের জরিমানার অঙ্ক ১ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে সোজা ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ৪ বছরের বদলে এক টানা ৮ বছরের জন্য দেশের যাবতীয় সরকারি পরীক্ষার কাজ থেকে নিষিদ্ধ বা ডিবার করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সংগঠিত চক্রের ক্ষেত্রে: অর্গানাইজড ক্রাইম বা আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস করার ঘটনা ঘটলে, সর্বনিম্ন শাস্তি ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৭ বছর করা হয়েছে। যেখানে অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী জরিমানার অঙ্ক সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

এছাড়াও, নতুন সংশোধনী বিলে ১২এ (12A) এবং ১২বি (12B) নামে দু’টি একদম নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রথমবার তদন্ত শেষ করার একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলো। কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সিবিআই বা সদ্য গঠিত স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)—যে সংস্থাই তদন্তের দায়িত্বে থাকুক না কেন, মামলা হাতে পাওয়ার ঠিক ২ মাসের মধ্যে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।