গভীর রাতে এ কোন সোনার পাহাড়! অনুব্রত-ঘনিষ্ঠের বাড়ি থেকে উদ্ধার ২৯ কোটি টাকা ও ১৫ কেজি সোনা

এক রাতে দৃশ্যপটে ভোজবাজির মতো বদলে গেল সমস্ত সমীকরণ। পশ্চিম বর্ধমান ও বীরভূমের সীমানা ছাড়িয়ে এবার আর্থিক দুর্নীতির এক অবিশ্বাস্য ভূস্বর্গ আবিষ্কার করল প্রশাসন। বীরভূমের মহম্মদবাজার থানার মদনপুর এলাকার একটি সাধারণ দোতলা বাড়িতে গভীর রাতে হানা দিয়ে পুলিশ যা উদ্ধার করল, তা দেখে চোখ কপালে উঠেছে তদন্তকারীদেরও। ম্যারাথন তল্লাশিতে উদ্ধার হয়েছে নগদ প্রায় ২৯ কোটি টাকা এবং ১৫ কেজি খাঁটি সোনা! টাকার অঙ্ক এতটাই বিশাল যে, তা গোনার জন্য তড়িঘড়ি আনতে হয়েছে একাধিক হেভি-ডিউটি কারেন্সি কাউন্টিং মেশিন। বুধবার সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলেও চলল সেই টাকার বান্ডিল গোনার ম্যারাথন পালা। আর এই আকস্মিক ঘটনায় এখন প্রবলভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজ্য রাজনীতি।

কে এই রহস্যময় চরিত্র?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, যে বাড়িটি থেকে এই বিপুল পরিমাণ সোনা ও নগদ টাকা উদ্ধার হয়েছে, সেটি মিনার মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির। তিনি পেশায় একজন প্রাক্তন সরকারি বাসচালক এবং প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিনের চর্চা রয়েছে, এই টুলু মণ্ডল একসময়ে বীরভূমের দাপুটে ও বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতা অনুব্রত মণ্ডলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তের লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বীরভূমের পুলিশ সুপার বিদিত রাই ভুন্দেেশ জানিয়েছেন, এই বিপুল অর্থ ও সোনা কোনো সাধারণ সঞ্চয় হতে পারে না; এটি একটি সুসংগঠিত অপরাধ চক্র এবং বেআইনি সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল।

কোথায় জাল ছড়িয়েছিল?
গোপন সূত্রে পাওয়া নির্দিষ্ট খবরের ভিত্তিতে পুলিশ প্রথমে জানতে পারে, একটি অপরাধ চক্রের কালো টাকা লুকিয়ে রাখা হয়েছে টুলু মণ্ডলের এক সহযোগী নাজিবুদ্দিনের বাড়িতে। এরপরই পুলিশের একটি বিশেষ দল মিনার মণ্ডলের ওই বাড়িতে আকস্মিক হানা দেয়। সেখান থেকেই উদ্ধার হয় নগদ ২৯ কোটি টাকা এবং ১৫ কেজি সোনা। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় ইতিমধ্যেই একজনকে আটক করে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ।

প্রাথমিক তদন্তে একে একে উঠে আসছে সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। কীভাবে এক সাধারণ বাসচালক থেকে শত শত কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন এই টুলু মণ্ডল? এই ঘটনার নেপথ্যে কি বালি ও পাথর খাদানের বেআইনি কারবার এবং ডিসিপিআর (DCR) জালিয়াতির রমরমা রাজত্ব ছিল? শুধু তাই নয়, দুবাইয়ে তাঁর কোনো হোটেল রয়েছে কি না, মেয়ের রাজকীয় ও বিলাসবহুল বিয়েতে ঠিক কত টাকা ওড়ানো হয়েছিল, কিংবা জামাইয়ের পরিবারের সোনা পাচার কাণ্ডের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—সবকটি বিস্ফোরক দিক এখন তদন্তের ডায়েরিতে নথিবদ্ধ করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই এই ঘটনার জেরে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর। রাজ্যের শাসক শিবিরকে সরাসরি কাঠগড়ায় তুলে কড়া আক্রমণ শানিয়েছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা অগ্নিমিত্রা পাল। হুঙ্কার ছেড়ে তিনি তীব্র ভাষায় বলেন, “টুলু মণ্ডল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আজ তাঁর বাড়ি থেকে সোনা ও টাকা উদ্ধার হচ্ছে… এই ধরনের দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষগুলোই বাংলার সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করেছে।” সিন্ডিকেটের এই অঢেল কালো টাকার শেকড় ঠিক কতদূর গভীরে গেঁথে রয়েছে এবং এর সঙ্গে রাজ্যের কোনো বড় প্রভাবশালীর সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করতে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে প্রশাসন।