গর্ভকালীন হেপাটাইটিস বি নিয়ে ভয় নয়, সচেতনতাই পারে আপনার অনাগত সন্তানকে সুস্থ রাখতে; জানুন বিস্তারিত

মাতৃত্ব প্রতিটি নারীর জীবনে এক পরম আনন্দের অনুভূতি। কিন্তু গর্ভকালীন সময়ে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা এবং সংক্রামক ব্যাধির আশঙ্কা হবু মায়েদের মনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করে। এই ধরনের সমস্ত উদ্বেগের মধ্যে অন্যতম একটি সংবেদনশীল ও গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হলো হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, হেপাটাইটিস বি হলো একটি মারাত্মক লিভারের রোগ, যা ‘হেপাটাইটিস বি ভাইরাস’ (HBV)-এর কারণে হয়ে থাকে। কোনো নারীর যদি গর্ভাবস্থায় এই ভাইরাস ধরা পড়ে, তবে তা মা ও অনাগত সন্তান—উভয়ের জন্যই এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে এই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং সন্তানকে সুস্থ রাখা যায়।
গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস বি পজিটিভ হওয়ার অর্থ এই নয় যে মা আর সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পারবেন না। এই রোগটি মূলত সংক্রামিত রক্ত, বীর্য বা অন্যান্য শারীরিক তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। তবে এর সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি হলো, গর্ভাবস্থায় যদি কোনো নারীর শরীরে এই ভাইরাস থাকে, তবে প্রসবের সময় বা সন্তান জন্ম নেওয়ার ঠিক অব্যবহিত পরেই নবজাতকের শরীরে এই ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি সবথেকে বেশি থাকে। এই পরিস্থিতিকে চিকিৎসা পরিভাষায় ‘ভার্টিকাল ট্রান্সমিশন’ বলা হয়। সৌভাগ্যবশত, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর অত্যন্ত কার্যকরী প্রতিরোধক ব্যবস্থা রয়েছে। গর্ভাবস্থার প্রথম ট্রাইমেস্টারে রুটিন চেকআপের অংশ হিসেবে প্রত্যেক হবু মায়েরই হেপাটাইটিস বি স্ক্রিনিং বা অ্যান্টিজেন টেস্ট (HBsAg) করানো অত্যন্ত বাধ্যতামূলক। যদি পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ আসে, তবে ঘাবড়ে না গিয়ে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ গাইনোকোলজিস্ট এবং হেপাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে ভাইরাসের মাত্রা (Viral Load) কতখানি রয়েছে, তা পরিমাপ করার জন্য কিছু উন্নত রক্ত পরীক্ষা করানো হয়। যদি ভাইরাসের মাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকে, তবে গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারেন, যা রক্তে ভাইরাসের পরিমাণ কমিয়ে দেয় এবং প্রসবের সময় সন্তানের শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ কমিয়ে দেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নবজাতকের সুরক্ষা। চিকিৎসকদের কঠোর নির্দেশিকা অনুযায়ী, হেপাটাইটিস বি পজিটিভ মায়ের কোল থেকে পৃথিবীতে আসা প্রতিটি শিশুকে জন্মের ঠিক পরপরই—অর্থাৎ প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই—অবশ্যই হেপাটাইটিস বি ইমিউনোগ্লোবুলিন (HBIG) ইনজেকশন এবং হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দিতে হবে। এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাটি গ্রহণ করলে নবজাতকের শরীরে দীর্ঘমেয়াদী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে এবং সে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে। পাশাপাশি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশিকা মেনে স্তন্যপান করানোর ক্ষেত্রেও কোনো বাধা থাকে না, যদি শিশুকে সঠিক সময়ে এই প্রতিষেধকগুলি দেওয়া হয়ে থাকে। পরিশেষে, আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে পালন করাই হলো হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত মায়ের সুস্থ সন্তান উপহার পাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি।