দেশের অতিধনী ক্লাবের সদস্য সংখ্যা এক লাফে ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি! মোদী সরকারের হাতে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য!

ভারতের অতিধনীদের এক্সক্লুসিভ ক্লাব যেন দিন দিন আরও বেশি প্রসারিত হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক ভূচিত্রে এক বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে বার্ষিক ১০০ কোটি টাকা বা তার থেকেও বেশি আকাশচুম্বী আয় করেন এমন করদাতার সংখ্যা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে ভারতীয় সংসদের উভয় কক্ষে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়েছে। সরকারের পেশ করা এই তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ মূল্যায়ন বর্ষে (AY) দেশে ১০০ কোটি টাকার বেশি বার্ষিক আয় প্রদর্শনকারী সৌভাগ্যবান মানুষের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট ৫৭৬ জনে।

সংসদের চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে অর্থ মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী একটি লিখিত প্রশ্নের লিখিত জবাবে এই পরিসংখ্যান সকলের সামনে তুলে ধরেছেন। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ মূল্যায়ন বর্ষে এই অতিধনীর সংখ্যা ছিল ৪১৫ জন। আর যদি সামান্য কয়েক বছর পেছনে ফিরে তাকানো যায়, তবে দেখা যাবে যে ২০২১-২২ মূল্যায়ন বর্ষে দেশে ১০০ কোটি টাকার বেশি বার্ষিক আয় করা করদাতার সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪২ জন। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিগত মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশের শীর্ষস্তরের এই অতিবিত্তশালী মানুষের সংখ্যা শতকরা হিসাবে ৩০০ শতাংশেরও অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর এক নতুন চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

সংসদে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকটি মূল্যায়ন বর্ষ ধরে অতিধনীদের এই সংখ্যাটি বিভিন্ন ওঠানামার মধ্যে দিয়েই বর্তমান উচ্চতায় এসে পৌঁছেছে। ২০২১-২২ মূল্যায়ন বর্ষে এই সংখ্যা যেখানে ১৪২ জনে সীমাবদ্ধ ছিল, তা বেড়ে ২০২২-২৩ মূল্যায়ন বর্ষে সোজা ৩০১ জনে গিয়ে পৌঁছায়। এরপর ২০২৩-২৪ মূল্যায়ন বর্ষে এই সংখ্যাটি সামান্য হ্রাস পেয়ে ২৮৪ জনে নেমে এসেছিল। কিন্তু তারপরেই আবার নাটকীয়ভাবে উর্ধ্বমুখী হয় গ্রাফ। ২০২৪-২৫ মূল্যায়ন বর্ষে এই সংখ্যা রেকর্ড গড়ে ৪১৫ জনে পৌঁছায় এবং চলতি ২০২৫-২৬ মূল্যায়ন বর্ষে তা সর্বকালীন রেকর্ড ভেঙে একেবারে ৫৭৬ জনে গিয়ে ঠেকেছে।

সংসদে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে “বিলিয়নেয়ার” শব্দটির বিশেষ উল্লেখ থাকলেও, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ভারতীয় আইনে ‘বিলিয়নেয়ার’ বা শতকোটিপতি শব্দের নির্দিষ্ট কোনো আনুষ্ঠানিক বা আইনি সংজ্ঞা নেই। যেহেতু আইনগতভাবে বা প্রচলিত আয়কর আইনে (১৯৬১ সালের পুরনো আইন হোক কিংবা সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের নতুন আয়কর আইন) এই পদের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা বা আইনি পরিকাঠামো নেই, তাই সরকার মূলত বিভিন্ন করদাতার দাখিল করা আয়কর রিটার্ন (ITR)-এর তথ্যের ওপর নির্ভর করেই ১০০ কোটি বা তার বেশি আয় করা ব্যক্তিদের দেশের শীর্ষ ধনী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। এছাড়া, ভারতে রেজিস্টার্ড বিলিয়নেয়ারদের মোট সম্পত্তির কোনো সরকারি হিসাব আলাদাভাবে রাখা হয় না, কারণ ২০১৬ সালের পহেলা এপ্রিল থেকে দেশে ‘ওয়েলথ-তার্ক্স অ্যাক্ট, ১৯৫৭’ অর্থাৎ সম্পত্তি কর আইন সম্পূর্ণভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে।

দেশে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না, সেই সংক্রান্ত তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে অর্থ মন্ত্রক নিজস্ব কোনো পৃথক সমীক্ষার পরিবর্তে দেশের বিভিন্ন প্রামাণ্য সরকারি তথ্যের ওপর জোর দিয়েছে। মন্ত্রকের পক্ষ থেকে সাফাই দিয়ে জানানো হয়েছে যে, হাউসহোল্ড কনজাম্পশন এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (HCES) ২০২৩-আর এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্রামীণ এলাকায় অর্থনৈতিক বৈষম্য মাপার প্রধান সূচক তথা গিনি কোএফিশিয়েন্ট ০.২৬৬ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ০.২৩৭-এ। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলেও এই সূচক ০.৩১৪ থেকে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ০.২৮৪। এই সমস্ত পরিসংখ্যান গ্রামীণ ও শহর—উভয় অঞ্চলেই সামগ্রিক বৈষম্য হ্রাসের জোরালো ইঙ্গিত বহন করে।

পাশাপাশি দেশের বর্তমান শ্রমবাজারের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সি নাগরিকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০২১-২২ সালের ৩.৬ শতাংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৫ সালে মাত্র ৩.১ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশের নীতি আয়োগের সর্বসাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষ থেকে শুরু করে ২০২২-২৩ অর্থবর্ষের দীর্ঘ সময়ের মধ্যে প্রায় ২৪ কোটি ৮২ লক্ষ সাধারণ মানুষ দেশের বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের করাল গ্রাস থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করেছেন।

এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যবধান কমাতে এবং সুষম উন্নয়ন ঘটাতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন প্রগতিশীল কর নীতি ও জনমুখী কল্যাণমূলক প্রকল্পের ওপর ভরসা রাখছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রক। দেশের প্রগতিশীল আয়কর কাঠামোয় উচ্চ আয়যুক্ত বিত্তবান ব্যক্তিদের সাধারণ করের পাশাপাশি অতিরিক্ত সারচার্জ বা করের বোঝা বহন করতে হয়। এছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, সমবায় আন্দোলন এবং আধুনিক পরিকাঠামো খাতের উন্নয়নে বিশেষ কর ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, পিএম জন ধন যোজনা, পিএম-কিষাণ সম্মান নিধি, আয়ুষ্মান ভারত এবং জল জীবন মিশনের মতো দেশের মেগা ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পগুলির যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সমাজের সর্বস্তরে উন্নয়নের আলো পৌঁছে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় প্রশাসন।