“জরুরি অবস্থার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল!” জেএনইউ নেত্রীকে ধরতে গিয়ে তুলকালাম সংসদে!

বুধবার দেশের রাজধানী দিল্লির বুকে অবস্থিত সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দিল্লি পুলিশের অতর্কিত তল্লাশি অভিযান এবং হানা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যসভার অন্দরে তীব্র রাজনৈতিক উত্তাপ ও হট্টগোল শুরু হয়। সংসদের উচ্চকক্ষে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়টি প্রথম জোরালোভাবে উত্থাপন করেন সিপিআই(এম)-এর বিশিষ্ট সাংসদ জন ব্রিটাস। তাঁর এই দাবির সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য বিরোধী দলের সাংসদরা তাঁদের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে তীব্র স্লোগান দিতে শুরু করেন। জন ব্রিটাস সরাসরি প্রশ্ন তোলেন যে, একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলের দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে এই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও ব্রিটাসের এই বক্তব্যের জোরালো সমর্থন জানান। অন্যদিকে, শাসক দলের পক্ষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এর জবাবে সাফ জানান যে, দিল্লি পুলিশ সম্পূর্ণভাবে আইন মেনেই নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে এবং এই নিয়ে অহেতুক হট্টগোল করা বা সংসদীয় কাজ বানচাল করা সম্পূর্ণ অনুচিত।
পুরো ঘটনার পটভূমি খতিয়ে দেখলে জানা যায়, সিপিআই(এম) সাংসদ জন ব্রিটাসের ভাষ্যমতে, গত মঙ্গলবার যন্তর মন্তরে আয়োজিত একটি সুনির্দিষ্ট ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম বিশিষ্ট মুখ, এসএফআই নেত্রী এবং জেএনইউ ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন সভাপতি আইশে ঘোষকে বেআইনিভাবে আটক করার দুরভিসন্ধি নিয়েই দিল্লি পুলিশের একদল কর্মকর্তা সরাসরি জাতীয় দল সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হানা দেন। এই প্রসঙ্গে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আইশে ঘোষ সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট জানান যে, ২০২১ সালের একটি পুরনো মামলার জেরে তার বিরুদ্ধে একটি জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে তিনি নিজেই একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং জানতে পেরেছেন যে পরোয়ানাটি নাকি কোনো আইনি নিয়ম না মেনে কেবল হোয়াটসঅ্যাপ বা ফোনের মাধ্যমে তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। আইশে ঘোষের প্রশ্ন, ডিজিটাল মাধ্যমে বা ফোনে কি কখনো এভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাঠানো যায়? আইনি নিয়ম অনুযায়ী পরোয়ানা সবসময় সশরীরে এবং দাপ্তরিক নথিপত্র সহকারে পৌঁছে দিতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর মূল লক্ষ্য হলো সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের মনোবল অটুট রাখতে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ও আইনি প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে পুলিশ জানায় যে, ২০২১ সালের একটি পুরনো মামলায় মাননীয় আদালত ঐশে ঘোষের বিরুদ্ধে একটি জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। দীর্ঘ শুনানির সময় ঘোষ আদালতে পরপর একাধিকবার হাজিরা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বিচারপতির নির্দেশেই এই পরোয়ানা জারি করা হয়। সেই আদালতের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে কার্যকর করতেই দিল্লি পুলিশ অভিযুক্ত ঘোষকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই পুলিশ কর্মীরা সিপিআই(এম)-এর প্রধান সদর দপ্তর অর্থাৎ দিল্লির একেজি ভবনে প্রবেশ করেন, যদিও তল্লাশিতে সেখানে তাঁকে পাওয়া যায়নি।
বুধবার সকালে রাজ্যসভার অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধী শিবিরের সাংসদরা দিল্লিতে আইশে ঘোষকে গ্রেপ্তারের এই অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। পাশাপাশি, নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের জোরালো প্রতিবাদে জাতীয় রাজধানীতে লাগাতার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের দমনপীড়নের বিষয়ে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের একটি বিস্তারিত ও লিখিত বিবৃতির দাবিও তাঁরা সংসদীয় মঞ্চে জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন। সভার সমস্ত পূর্বনির্ধারিত ও তালিকাভুক্ত কার্যবিবরণী পেশ করার ঠিক পরেই প্রবীণ সাংসদ জন ব্রিটাস আইশে ঘোষের এই পুলিশি তল্লাশির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে উত্থাপন করেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, ২০২১ সালের জেএনইউ ছাত্র আন্দোলনের একটি পুরনো ঘটনাকে সামনে এনে আইশে ঘোষকে হেনস্থা ও গ্রেপ্তার করতে সাদা পোশাকে দিল্লি পুলিশের একটি বিশেষ দল রাতের অন্ধকারে প্রধান রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে বলপূর্বক প্রবেশ করে। ব্রিটাস পুলিশের এই কদর্য পদক্ষেপকে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে দাবি করেন যে, যন্তর মন্তরের ন্যায়সঙ্গত বিক্ষোভে অংশ নেওয়াটাই ছিল আইশে ঘোষের একমাত্র অপরাধ। বিরোধীদলীয় নেতা মল্লিকার্গুন খাড়গে তাঁর এই সমস্ত যুক্তির তীব্র প্রতিধ্বনি করে অভিযোগ করেন যে, দেশে আজ গণতন্ত্র সম্পূর্ণ বিপন্ন। কংগ্রেসের প্রবীণ সভাপতি প্রশ্ন তোলেন, একটি দেশের প্রধান জাতীয় রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশকে বেআইনিভাবে প্রবেশের নির্দেশ কে বা কারা দিয়েছে?
বিরোধী শিবিরের এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগের পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে সংসদের উচ্চকক্ষের নেতা জেপি নাড্ডা সদনে স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, এটি সম্পূর্ণভাবে একটি সাধারণ আইনশৃঙ্খলার বিষয় এবং এর মধ্যে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। তিনি আরও যোগ করেন যে, পুলিশ বাহিনীকে তাদের পেশাদারিত্ব বজায় রেখেই আইন অনুযায়ী কাজ করতে হয়েছে এবং তারা সেটাই করেছে। এই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান যে, সক্রিয় রাজনীতি বা রাজপথের বিক্ষোভে সরাসরি জড়িত যেকোনো ছাত্রের বিরুদ্ধে এমন আইনি পদক্ষেপ করা যেতে পারে। নিজের অতীতের কথা স্মরণ করে নাড্ডা বলেন যে, তিনিও একসময় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ঠিক একই ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। তিনি নিজের উদাহরণ দিয়ে বলেন, “জরুরী অবস্থার সেই কালো দিনগুলোতে আমাকে সরাসরি ক্লাসরুম থেকেও অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।” তিনি দাবি করেন যে তাঁর জীবনে এমন ঘটনা দু’বার ঘটেছে। তবে শাসক পক্ষের এমন সাফাইয়ের পর সিপিআই(এম) এবং কংগ্রেস সহ অন্যান্য বিরোধী দলের সদস্যরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ওয়াকআউট করেন এবং সংসদ চত্বরে ব্যাপক প্রতিবাদ প্রদর্শন করেন।