এক কোটির মাথার দাম! ২০ বছর পর পুলিশের জালে মোস্ট ওয়ান্টেড মাওবাদী শীর্ষনেতা মিসির বেসরা!

ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ইতিহাস এবং মাওবাদী বিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করল ঝাড়খণ্ড পুলিশ (Jharkhand Police)। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর চোখের বালি হয়ে আত্মগোপন করে থাকা সিপিআই (মাওবাদী) (CPI Maoist)-এর মোস্ট ওয়ান্টেড শীর্ষ নেতা তথা পলিটব্যুরোর একমাত্র জীবিত ঝাড়খণ্ড-ভিত্তিক সদস্য মিসির বেসরা অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন। মঙ্গলবার সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ধানবাদের বারওয়াড্ডা থানার অন্তর্গত মানিয়াডিহ এলাকা থেকে তাঁকে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে যে, শুধু এই শীর্ষ নেতাই নন, এই একই ঝটিকা অভিযানে তাঁর দুই সহযোগীকেও আটক করা হয়েছে। দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যত নাকানিচোবানি খাওয়ানো ৬৬ বছর বয়সি এই নেতার মাথার ওপর কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের তরফ থেকে ১ কোটিরও বেশি টাকার মোটা অঙ্কের পুরস্কারমূল্য ঘোষিত ছিল।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, মিসির বেসরা দীর্ঘদিন ধরে ভাস্কর এবং সাগর নামে একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার করে আত্মগোপন করে ছিলেন। নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ আদর্শগত দিক পরিচালনা এবং সামরিক কৌশল নির্ধারণে তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে গোয়েন্দাদের দাবি। এর আগে ২০০৭ সালে একবার ঝাড়খণ্ডে তাঁকে গ্রেফতার করা হলেও, ২০০৯ সালে বিহারের লাখিসরাই আদালতে প্রোডাকশন ওয়ারেন্টে হাজির করানোর সময় অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তিনি পুলিশ হেফাজত থেকে চম্পট দেন এবং পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। সেই রোমহর্ষক ঘটনার পর থেকেই দেশের একাধিক রাজ্যে তাঁকে ধরতে লাগাতার চিরুনি তল্লাশি ও অভিযান চালিয়ে আসছিল যৌথ বাহিনী। সাম্প্রতিক অতীতে মাওবাদী সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের অধিকাংশই হয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন কিংবা একে একে আত্মসমর্পণ করেছেন। এমতাবস্থায় মিসির বেসরাকে সংগঠনের শেষ সারির অন্যতম শেষ ও প্রভাবশালী পলিটব্যুরো সদস্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছিল, যার গ্রেফতারে মাওবাদী নেটওয়ার্কে বড়সড় ধস নামল।

শুধু মিসির বেসরার গ্রেফতারিই নয়, একই সঙ্গে ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী দমনে আরও একটি বিরাট সাফল্যের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। সাম্প্রতিক এই সাঁড়াশি অভিযানে একযোগে মোট ১৬ জন সশস্ত্র মাওবাদী চরমপন্থী পুলিশের কাছে এসে আত্মসমর্পণ করেছেন। এই আত্মসমর্পণকারী উগ্রপন্থীদের মধ্যে মোট ছ’জন শীর্ষ নেতার মাথার দাম মিলিয়ে যৌথভাবে ৩৯ লক্ষ টাকা ধার্য করা হয়েছিল। যাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কুখ্যাত মাওবাদী নেতা সন্তোষ মাহাত, যিনি এলাকায় বাসুদেব দা বা দিলীপ নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে খুন, নাশকতা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতা সহ মোট ১২৮টি মারাত্মক মামলা ঝুলে রয়েছে এবং তাঁর মাথার দাম ছিল ১৫ লক্ষ টাকা। এছাড়া এদিনের এই ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় সংগঠনের দুই সাব-জোনাল কমিটি সদস্য ও দুই এরিয়া কমিটি স্তরের নেতའও অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ বেছে নিয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই বর্তমান বর্ষে ঝাড়খণ্ডজুড়ে চলা ধারাবাহিক মাওবাদী বিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত মোট ৯৩ জন মাওবাদীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আত্মসমর্পণ করেছেন ৪৫ জন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ২২ জন মাওবাদী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত ও মোস্ট ওয়ান্টেড মিসির বেসরার এই গ্রেফত্ৰকে নিরাপত্তা বাহিনীর মুকুটে সবথেকে উজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক সাফল্য বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল।