“কথা না রাখলে আপনার বিরুদ্ধেও…!” রাহুল গান্ধীকে সোজা সাপটা সতর্কবার্তা ফেরিওয়ালা মহম্মদ ইরফানের

স্কুলের গণ্ডি কোনোদিন পেরোননি, যুক্ত নন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও—তবুও দিল্লির যন্তর মন্তরে নিট (NEET-UG) প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত ছাত্র আন্দোলনের মাঝে নিজের তীক্ষ্ণ ও চাঁচাছোলা যুক্তিতে গোটা দেশের নজর কেড়ে নিয়েছিলেন সাধারণ এক ফেরিওয়ালা মহম্মদ ইরফান। গলায় সাধারণ গামছা, পরনে সাদামাটা জামা—’ককরোচ জনতা পার্টির’ (CJP) মঞ্চে দাঁড়িয়ে সাবলীলভাবে দেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা পাঠ এবং বিখ্যাত কবি আহমেদ ফারাজের কবিতা আবৃত্তি করে রাতারাতি ইন্টারনেটে সেনসেশন হয়ে ওঠা সেই ইরফান এ বার দেখা করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর (Rahul Gandhi) সঙ্গে। তবে নেতার সামনে গিয়ে কোনো তোষামোদ নয়, বরং অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তিনি রাহুলকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, গরিব ও শ্রমিকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যতে পূরণ না হলে তাঁর বিরুদ্ধেও তীব্র আন্দোলনে নামতে দু’বার ভাববেন না তিনি।

রাহুল গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা ও স্পষ্ট বার্তা:
সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে নিজের এই হাই-প্রোফাইল সাক্ষাতের পুরো অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন দিল্লির সাবদা জেজে কলোনির (Sabda JJ Colony) বাসিন্দা ইরফান। তিনি জানান, রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেশের শীর্ষ নেতাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে তিনিও দেশের ক্ষমতার মসনদে বসতে পারেন। তাই পরিযায়ী শ্রমিক থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ দিনমজুরদের সার্বিক কল্যাণে যেন তিনি এখন থেকেই সুনির্দিষ্ট কাজ করেন। তবে ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি রাহুলকে সোজা ভাষায় সতর্ক করে ইরফান তাঁকে সাফ জানিয়ে দেন, “আপনি যদি কখনো কথা দিয়ে কথা না রাখেন বা সাধারণ মানুষের দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে যান, তবে আপনার বিরুদ্ধেও আমরা ঠিক এইভাবেই রাস্তায় নেমে তীব্র প্রতিবাদ জানাব। আমি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, আমি দেশের ভালো চাই। এই দেশ উন্নত হলে দেশের সব সাধারণ মানুষ যেন তার সমান সুবিধা পায়, কেউ যেন বিন্দুমাত্র বঞ্চিত না হয়।”

শিক্ষিত রাজনীতিকদের সামনে গরিবের বাস্তব চিত্র তুলে ধরলেন ইরফান:
স্মার্টফোনে ভয়েস সার্চ ব্যবহার করে ইউটিউবের মাধ্যমে নিজের জ্ঞান ও রাজনৈতিক বোধ অর্জন করা এই ফেরিওয়ালা দেশের শ্রমজীবী মানুষ ও ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থার যে করুণ চিত্র রাহুলের সামনে তুলে ধরেন, তা সত্যিই ভাবনার খোরাক জোগায়। তিনি রাহুল গান্ধীকে জানান যে, ২০২৪ সালের এনসিআরবি (NCRB)-র সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী দেশে যে পৌনে দু’লাখ মানুষ আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের মধ্যে এক惊য়ে দেওয়া তথ্য হলো যে এর প্রায় ৩১ শতাংশই হলো গরিব দিনমজুর। মূলত চরম আর্থিক অনটন এবং মানসিক চাপই এই মর্মান্তিক আত্মহত্যার প্রধান কারণ।

ইরফানের সোজাসাপ্টা প্রশ্ন ছিল, সরকারি খাতায় দেশের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৮,০০০ টাকা বলে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করার পরেও শ্রমিকরা পান মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা। পাশাপাশি, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়ার প্রবণতা এবং আইটিআই (ITI) বা পলিটেকনিকের মতো সরকারি কলেজগুলি যেভাবে ধীরে ধীরে মধ্যবিত্তের নাগালে চলে যাচ্ছে—তাতে গরিবের ছেলেমেয়েরা কীভাবে উচ্চশিক্ষা ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সেই নির্মম বাস্তব চিত্রও রাহুলের সামনে তুলে ধরেন ইরফান।

প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মজার ফোন কল ও রাহুলকে নিয়ে মন্তব্য:
এই রাজনৈতিক ও সমাজসচেতন আলাপচারিতার মাঝেই হঠাৎ রাহুলের মোবাইলে ফোন করেন তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। ফোন ধরে প্রিয়াঙ্কা মজাচ্ছলে ইরফানকে আবদার করে বলেন, “দয়া করে রাহুলকে একটু বুঝিয়ে বলুন যে ও যেন এবার অন্তত বিয়েটা করে নেয়! ও আমার কথা একদমই শুনতে চায় না।” জবাবে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে ইরফান রসিকতা করে বলেন, “আমার তো ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় রাহুলের বিয়ে না করাই ভালো! উনি আমার থেকে বয়সে অনেক বড় এবং সত্যিই একজন ভীষণ মনখোলা ও ভালো মানুষ।” এই সাক্ষাতের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বিশেষ পোস্ট করে রাহুল গান্ধী লেখেন, “ইরফানের ভাবনা-চিন্তা দেশের তরুণ সমাজের প্রকৃত শক্তির এক অনন্য প্রতীক। ওঁর মতো লাখ লাখ তরুণই আগামীর এই দেশের আসল ভবিষ্যৎ।”

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ক্ষোভ:
ভবিষ্যতে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও দেখা করবেন কিনা—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আত্মবিশ্বাসী ইরফান জানান যে, মতাদর্শগত বা রাজনৈতিক ফারাক থাকলেও প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বিন্দুমাত্র কোনো বাধা নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী মোদির আগে তিনি সবথেকে আগে দেখা করতে চান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের (Amit Shah) সঙ্গে।

ইরফানের মূল ক্ষোভ হলো তাঁর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। তিনি অভিযোগ করেন যে, তাঁর গোটা এলাকা জুড়ে রমরমিয়ে মাদকের কারবার চললেও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এ বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন এবং কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না। তাঁর বস্তির একটি ১২ বছরের শিশুও খুব ভালো করে জানে কোথায় গাঁজা বা মাদক বিক্রি হচ্ছে, অথচ পুলিশ নাকি এ বিষয়ে ‘কিছুই জানে না’! কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেলে তিনি সবার আগে পুলিশের এই চূড়ান্ত নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধমূলক উদাসীনতার কথাই সরাসরি তুলে ধরবেন বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন।