বিক্ষোভ মানেই বলপ্রয়োগ নয়! ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) আন্দোলন দমন মামলায় দিল্লির পুলিশকে ভর্ৎসনা সুপ্রিম কোর্টের

দিল্লিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র সংসদ অভিযান দমনের নামে পুলিশি বলপ্রয়োগ এবং অতিরিক্ত দমনপীড়নের ঘটনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে মঙ্গলবার কড়া মন্তব্য করলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। এদিনের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কেবলমাত্র একদল মানুষ সমবেত হয়ে বা কোনো রাজনৈতিক অভিযানের মাধ্যমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা দমনের নামে নির্বিচারে তাদের ওপর বলপ্রয়োগ করা আইনসিদ্ধ হতে পারে না। পাশাপাশি, ওই একই মামলায় প্রধান বিচারপতি অত্যন্ত জোরালোভাবে এই কথাও বলেছেন যে, যে সমস্ত পুলিশ কর্মী বিক্ষোভ দমনের সময় অতিরিক্ত ও মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছেন, তাঁদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।
পুলিশের মানসিকতা ও ‘স্ট্যাটাস অফ পুলিশ ইন ইন্ডিয়া, ২০২৫’ রিপোর্টের চাঞ্চল্যকর তথ্য:
শীর্ষ আদালতের এই কঠোর অবস্থানের ঠিক বিপরীত চিত্রই ফুটে উঠেছে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিজস্ব মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। গত বছর অনুষ্ঠিত একটি সর্বভারতীয় সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রকাশিত ‘স্ট্যাটাস অফ পুলিশ ইন ইন্ডিয়া, ২০২৫’ (Status of police in India, 2025) নামক রিপোর্টে দেশের পুলিশ বাহিনীর ভেতরের যে রূপটি প্রকাশ্যে এসেছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে—
বলপ্রয়োগের অধিকার: দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পুলিশ কর্মী মনে করেন যে, যেকোনো বিক্ষোভ আন্দোলন এবং আইনশৃঙ্খলাজনিত জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলায় তাদের অবাধে ও কোনো বাধা ছাড়াই বলপ্রয়োগ করার পূর্ণ অধিকার থাকা উচিত। তাঁদের মতে, বল প্রয়োগের জন্য যদি পুলিশকে পরবর্তীতে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়, তবে তারা আর সঠিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে না।
গ্রেপ্তারের অবাধ স্বাধীনতা: বিভিন্ন পদমর্যাদার ওই ৭০ শতাংশ পুলিশ কর্মী আরও জোরালোভাবে মনে করেন যে, আদালতের কোনো পূর্বানুমতি বা নির্দেশ ছাড়াই যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক কিংবা গ্রেপ্তার করার সম্পূর্ণ ও অবাধ স্বাধীনতা তাদের হাতে থাকা উচিত।
হিংসার পক্ষে সওয়াল: এমনকি ৬০ শতাংশ পুলিশ কর্মী এই চরম মত প্রকাশ করেছেন যে, দাগি অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রয়োজনে পুলিশকেও আইন ভেঙে হিংসার আশ্রয় নেওয়ার অধিকার দেওয়া উচিত।
এনকাউন্টার ও বিচারবহির্ভূত হত্যা: এর চেয়েও ভয়াবহ তথ্য হলো, প্রায় ২২ শতাংশ পুলিশ কর্মী মনে করেন যে, কুখ্যাত দাগি অপরাধীদের আদালতের দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি দাঁড় করানোর কোনো প্রয়োজনই নেই, বরং তাদের সরাসরি মেরে ফেলা বা খতম করে দেওয়া উচিত।
থার্ড ডিগ্রি টর্চারের সওয়াল: সমীক্ষায় আরও জানা গিয়েছে যে, বলপ্রয়োগের পক্ষে জোরালো সওয়াল করা ওই পুলিশ কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ কর্মী অভিযুক্তদের ওপর কঠোর শারীরিক ও মানসিক পীড়ন বা বহুল প্রচলিত ‘থার্ড ডিগ্রি টর্চার’-এর পক্ষেওকালতি করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কনস্টেবল থেকে শুরু করে খোদ আইপিএস (IPS) অফিসারদের একাংশের অবস্থানও এই বলপ্রয়োগের প্রশ্নে প্রায় সম্পূর্ণ অভিন্ন। তবে এই সমীক্ষায় এও দেখা গিয়েছে যে, নিজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে কেরালা পুলিশের মধ্যে এই ধরনের সহিংসতা বা মারমুখী হওয়ার প্রবণতা দেশের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় সবচেয়ে কম।
আইন বনাম পুলিশের ভাবনা—সাংঘর্ষিক অবস্থান:
পুলিশ বাহিনীর এই ধরনের মনোভাব বা প্রত্যাশা কেবল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সামগ্রিক ভাবনার পরিপন্থী বা বিরোধিতাই করে না, এটি সরাসরি দেশের ফৌজদারি দণ্ডবিধি—যা বর্তমানে ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita / Bharatiya Nyaya Sanhita) নামে পরিচিত—তার সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক ও বিপরীত ভাবনা। ফৌজদারি দণ্ডবিধির মতো বর্তমান নতুন ন্যায় সংহিতাতেও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, কোনো ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেপ্তার করতে গেলে পুলিশকে সুনির্দিষ্ট কী কী কঠোর বিধি-নিয়ম আবশ্যিকভাবে মেনে চলতে হবে।
তার মধ্যে অন্যতম প্রধান এবং বাধ্যতামূলক নিয়মটি হলো—আটক কিংবা গ্রেপ্তার উভয় ক্ষেত্রেই পুলিশকে লিখিতভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তি কিংবা তাঁর পরিবার-পরিজনকে অবিলম্বে জানাতে হবে ঠিক কী কারণে এই আইনি পদক্ষেপ করা হচ্ছে। এছাড়া কোন নির্দিষ্ট মামলায় এবং কীভাবে ধৃত ব্যক্তি জড়িত, তার বিশদ বিবরণ অভিযুক্ত নিজে, তাঁর পরিবারের সদস্য কিংবা তাঁর আইনি আইনজীবীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জানাতে পুলিশ আইনগতভাবে বাধ্য। অথচ মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মীদের সিংহভাগের ভাবনা এই আইনি কাঠামোর সম্পূর্ণ উলটো পথে হাঁটে।
আদালতের ঐতিহাসিক রায় ও নির্দেশ:
উল্লেখ্য, দেশের সুপ্রিম কোর্ট, বিভিন্ন রাজ্যের হাইকোর্ট এবং জাতীয় ও রাজ্য মানবাধিকার কমিশনগুলি বারবার অত্যন্ত কড়া ভাষায় তাদের বিভিন্ন রায়ে ও নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তদন্ত বা জিজ্ঞাসাবাদের নামে কোনো অবস্থাতেই কোনো অভিযুক্ত বা নাগরিকের ওপর সামান্যতম শারীরিক বা মানসিক পীড়ন চালানো যাবে না। সিজেপি-র সংসদ অভিযান মামলার প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য এবং পুলিশি বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেশের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় এক যুগান্তকারী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বলেই মনে করছে সচেতন মহল।