জলমগ্ন রাস্তায় বড় বিপত্তি! সহকর্মীকে বাঁচাতে গিয়ে খোলা ট্রান্সফর্মারে প্রাণ হারালেন দুই ই-রিকশা চালক

শনিবার সন্ধ্যায় উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদ জেলায় এক হৃদয়বিদারক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত জনজীবনে নেমে আসে শোকের ছায়া। মাজহোলা থানার অন্তর্গত জলমগ্ন জয়ন্তিপুর ও শিবনগর এলাকায় একটি বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার থেকে আকস্মিক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই ই-রিকশা চালকের নির্মম মৃত্যু হয়েছে। প্রথম চালক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন অপর এক চালক, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। দুজনেই ঘটনাস্থলে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা তাদের মৃত বলে ঘোষণা করেন।

নিহত শ্রমিকদের পরিচয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। মৃতদের মধ্যে একজনের নাম ওমপ্রকাশ (বয়স ৪০ বছর), যিনি বিলারির স্থায়ী বাসিন্দা। অন্যজন রামমোহন (বয়স ৩৫ বছর), যিনি বদাউনের বিসাওলি এলাকার বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে এই দুজনেই মোরাদাবাদের মাজহোলা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া থাকতেন এবং নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে ই-রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। তাদের এই আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুতে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে শোকের অঝোর ধারা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিনের অবিরাম বর্ষণের ফলে ওই এলাকার রাস্তাঘাট সম্পূর্ণরূপে হাঁটু সমান জলে ডুবে গিয়েছিল। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ওমপ্রকাশ নিজের ই-রিকশা চালিয়ে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বিপরীত দিক থেকে একটি গাড়ি চলে আসায় এবং রাস্তার একটি বিপজ্জনক গর্ত এড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁর রিকশাটি রাস্তার ঠিক পাশেই থাকা একটি অরক্ষিত ও খোলা ট্রান্সফর্মারের খুব কাছে চলে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বৃষ্টির কারণে ট্রান্সফর্মার কিংবা তার লোহার সাপোর্ট সিস্টেমের মধ্যে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়েছিল। এর ফলে রিকশা সমেত ওমপ্রকাশ সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন। এই দৃশ্য দেখতে পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে তাঁকে বাঁচানোর জন্য ছুটে আসেন কাছাকাছি থাকা অন্য এক ই-রিকশা চালক রামমোহন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তিনিও বিদ্যুৎবাহী লোহার সংস্পর্শে চলে আসেন এবং মারাত্মকভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। দুজনেই রাস্তার জলমগ্ন মাটিতে অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়েন এবং গুরুতর দগ্ধ হন।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর পরই ঘটনাস্থলে চরম বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সাহসী বাসিন্দারা দ্রুত উদ্যোগী হয়ে বিদ্যুৎ দপ্তরে ফোন করে লাইন কাটেন এবং নিজেদের উদ্যোগে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে ওই দুই চালককে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁদের মৃত বলে ঘোষণা করেন।

স্থানীয় মানুষের অভিযোগের আঙুল সরাসরি বিদ্যুৎ দপ্তরের দিকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের জোরালো দাবি, এই ট্রান্সফর্মারটির আর্থিং ব্যবস্থা অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং এর আগেও এই নির্দিষ্ট স্থানে একাধিকবার ছোটখাটো বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, যদি বিদ্যুৎ দপ্তর সঠিক সময়ে ট্রান্সফর্মারটির সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করত এবং স্থানীয় জলাবদ্ধতা দূর করতে প্রশাসন তৎপর হতো, তবে এই দুই তাজা প্রাণ এভাবে ঝরে যেত না।

এই ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় গভীর শোক এবং চরম ক্ষোভের পরিবেশ বিরাজ করছে। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা সরাসরি বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা ও গুরুতর অবহেলাকে এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সরকারি মর্গে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি, সম্পূর্ণ ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ প্রশাসন।