শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার পরেই কি রাজনীতির ময়দানে নামছে ককরোচ জনতা পার্টি? অশুতোষ রানকার বিস্ফোরক মন্তব্যে তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি!

দেশজুড়ে তর্জনগর্জন ও ঐতিহাসিক নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস আন্দোলনের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের আকস্মিক ইস্তফার পর এবার জাতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এই হাই-প্রোফাইল পদত্যাগের ঠিক পরেই এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আলোচিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি (CJP)-র ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে, এই প্রবল প্রভাবশালী ছাত্র ও যুব আন্দোলনের নেপথ্যের মুখেরা কি তবে এবার প্রথাগত সক্রিয় রাজনৈতিক ময়দানে নামতে চলেছেন? সম্প্রতি একটি প্রথম সারির বেসরকারি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই জল্পনার বিষয়ে মুখ খুলেছেন সংগঠনের অন্যতম প্রধান মুখ অশুতোষ রানকা। তিনি সরাসরি রাজনীতির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে না দিয়ে এক রহস্যময় ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে সংগঠনের অপর শীর্ষ নেতা সৌরভ দাস অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাতারাতি কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করা তাঁদের বর্তমান লক্ষ্য নয়, বরং এই তরুণ যুব আন্দোলনকে দেশের প্রতিটি কোণায় ও তৃণমূল স্তরে সফলভাবে ছড়িয়ে দেওয়াই তাঁদের মূল এজেন্ডা।

সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে অশুতোষ রানকা নিজের ব্যক্তিগত জীবনের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান যে, লাগাতার আন্দোলনের জেরে গত বেশ কিছুদিন ধরে তিনি নিজের বাড়ির বাইরে অবস্থান করছেন। আপাতত নিজের জন্মভিটেয় ফিরে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে কিছু মূল্যবান সময় কাটানোই তাঁর জীবনের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার। বিগত দুই মাস ধরে দেশের রাজনৈতিক ময়দানে যা যা ঝড়ের বেগে ঘটে গিয়েছে, তা ঠান্ডা মাথায় বসে বিশ্লেষণ করার এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা ছক কষে নেওয়ার মতো যথেষ্ট মানসিক বিরতিরও প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনা করে তবেই তাঁদের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

যখন তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় যে, তিনি বা তাঁর সংগঠনের অন্য নেতারা আগামী দিনে কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দলে যোগ দেবেন কি না বা নিজস্ব দল গঠন করবেন কি না, তখন রানকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে জানান যে, “ভারতের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিশ্চিতভাবে কোনো কিছু নিয়েই কখনও ‘না’ বলা উচিত নয়।” তাঁর এই কূটনৈতিক অথচ অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোরদার শোরগোল পড়ে গেছে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই তরুণ মুখগুলি আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতির সমীকরণকে বড়োসড়ো ধাক্কা দিতে পারেন।

অন্যদিকে, সংগঠনের আরেক মূল চালিকাশক্তি সৌরভ দাস সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর চড়িয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP-র মূল লক্ষ্য কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠার বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নয়। তাঁর মতে, গোটা দেশে ইতিমধ্যেই শত শত রাজনৈতিক দল রয়েছে, কিন্তু সাধারণ যুব সমাজের মৌলিক প্রত্যাশা ও দাবিগুলি পূরণ করতে এগুলির প্রায় প্রত্যেকেই সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে কেন্দ্রে বা রাজ্যে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, দেশের তরুণ প্রজন্মের যৌক্তিক দাবিগুলি যাতে কোনোভাবেই অবহেলিত না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই শক্তিশালী আন্দোলনকে একেবারে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর CJP।

উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দিনই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই সাক্ষাৎকার দেন আন্দোলনের দুই শীর্ষ নেতা। রানকা দাবি করেন যে, ভারতীয় জনতা পার্টির জাতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে তাঁদের পূর্বনির্ধারিত চূড়ান্ত বৈঠকে পৌঁছনোর আগেই শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফাপত্র জমা হয়ে গিয়েছিল। এরপর মূলত আন্দোলনকারীদের অন্যান্য দাবিদাওয়াগুলি নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং দুই পক্ষের মধ্যে একটি ফলপ্রসূ সমঝোতা তৈরি হয়। সরকারের এই নমনীয় পদক্ষেপকে তাঁরা স্বাগত জানিয়েছেন। এছাড়া, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অতীতে দায়ের হওয়া একাধিক পুলিশি মামলা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে রানকা জোরালো দাবি জানান যে, শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনোভাবেই অপরাধীদের এক কাতারে ফেলা উচিত নয়। CJP শুরু থেকেই অহিংস আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং সরকারের সঙ্গে যে নতুন সমঝোতা হয়েছে, তাতে আন্দোলনকারী ও মূল সংগঠকদের বিরুদ্ধে রুজু হওয়া এফআইআরগুলি দ্রুত প্রত্যাহার করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন করে কোনো মামলা না করার বিষয়েও মৌখিক আশ্বাস মিলেছে। প্রায় এক মাস ধরে চলা অনড় মনোভাবের পর হঠাৎ কেন সরকার আলোচনায় বসল, সেই যৌক্তিক প্রশ্ন তুলে রানকা বলেন যে, এর সঠিক উত্তর প্রশাসনেরই দেশের মানুষের সামনে দেওয়া উচিত। কেন দেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের এতদিন ধরে তীব্র রোদ ও ঠান্ডার মধ্যে রাস্তায় বসে থাকতে বাধ্য হতে হলো, সেই জবাব সরকারকেই দিতে হবে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অধিকাংশ মানুষই অত্যন্ত সাধারণ পেশাদার নাগরিক, তাঁরা কেউই পেশাদার রাজনৈতিক আন্দোলনকারী বা পোড় খাওয়া রাজনীতিক নন বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন।