মুকেশ আম্বানির বিরাট মাস্টারস্ট্রোক! ৯০ হাজার কোটির ক্যাশ সুনামি, রিলায়েন্সের শেয়ারে বড় চমক আসছে?

ভারতীয় শেয়ার বাজারের অন্যতম বৃহৎ এবং প্রধান স্তম্ভ রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ গত তিন বছর ধরে ৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, খুচরা ব্যবসার আকস্মিক প্রসার এবং নতুন শক্তি খাতে অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মূলধন বা ক্যাপেক্স বিনিয়োগ করে আসছে। তবে এই সুদীর্ঘ ‘বিনিয়োগ পর্ব’ এখন তার চূড়ান্ত শীর্ষ পর্যায় অতিক্রম করে গেছে এবং সংস্থাটি বর্তমানে ‘পরিশোধ পর্বে’ বা আয়ের এক শক্তিশালী সুফল ভোগ করার পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিশ্বব্যাপী এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় দেশীয় ব্রোকারেজ সংস্থাগুলির (যেমন মতিলাল ওসওয়াল, অ্যামবিট ক্যাপিটাল এবং মরগ্যান স্ট্যানলি) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন অনুসারে, আগামী ২০২৬ থেকে ২০২৮ অর্থবর্ষের (FY26-FY28) মধ্যে রিলায়েন্স আনুমানিক প্রায় ৯০,০০০ কোটি টাকার ক্রমবর্ধমান ফ্রি ক্যাশ ফ্লো (FCF) বা মুক্ত নগদ প্রবাহ তৈরি করবে বলে প্রবলভাবে আশা করা হচ্ছে। আসুন অত্যন্ত সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়া যাক, ফ্রি ক্যাশ ফ্লো-এর এই বিরাট পরিবর্তন কীভাবে ঘটছে, রিলায়েন্সের কোন মূল ব্যবসায়িক ক্ষেত্রগুলি এটিকে চালিত করবে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এর আসল অর্থ কী।

গত তিন থেকে চার বছরের দীর্ঘ মেয়াদে রিলায়েন্স তাদের বিভিন্ন ব্যবসায় অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে প্রধানত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে জিও-র সর্বভারতীয় দ্রুতগতির ৫জি নেটওয়ার্ক চালু করা, রিলায়েন্স রিটেলের বিশাল স্টোর নেটওয়ার্ক এবং কুইক-কমার্স পরিষেবার ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং জামনগরে অত্যাধুনিক নতুন শক্তি গিগাফ্যাক্টরি স্থাপন। এই বিপুল পরিমাণ মূলধনী বিনিয়োগের কারণে বিগত বছরগুলিতে কোম্পানির ফ্রি ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক পর্যায়ে ছিল। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। যদিও বার্ষিক সমন্বিত মূলধনী ব্যয় এখনও প্রায় ১.৩ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি বহাল থাকবে, তবুও ৫জি-র মতো বিশাল পরিকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পগুলির সমাপ্তি ঘটায় এখন সরাসরি নগদ সাশ্রয় শুরু হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রথম ত্রৈমাসিকের (Q1) দুর্দান্ত ফলাফল এই ইতিবাচক পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সমন্বিত EBITDA বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪৭,৫০০ কোটি টাকা যা বার্ষিক ১১% বেশি, সমন্বিত নিট মুনাফা পৌঁছেছে ২০,৯০০ কোটি টাকা যা ১৬% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে এবং O2C খাতের EBITDA হয়েছে ১৭,০০০ কোটি টাকা।

রিলায়েন্সের এই দুর্দান্ত প্রবৃদ্ধির পেছনে মূলত চারটি প্রধান চালিকাশক্তি কাজ করছে। প্রথমত, ঐতিহ্যবাহী শক্তি ও পরিশোধন মার্জিন শক্তিশালী রয়েছে, যা জুন ত্রৈমাসিকে ব্যারেল প্রতি ১৪.৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, জিও প্ল্যাটফর্মসের মোবাইল পরিষেবার ক্রমবর্ধমান মূল্য ব্যবহারকারী প্রতি গড় আয় বা ARPU বৃদ্ধি করছে এবং এর আসন্ন আইপিও কোম্পানির ব্যালেন্স শিটের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে। তৃতীয়ত, রিলায়েন্স রিটেল আগামী তিন বছরে তাদের অপারেটিং EBITDA দ্বিগুণ করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। চতুর্থত, রিলায়েন্স ৩.০ মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই পরিকাঠামো, ডেটা সেন্টার, গিগাফ্যাক্টরি এবং সবুজ শক্তিতে তাদের ভবিষ্যৎ ইনিংসের শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করছে। অ্যামবিট ক্যাপিটালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের পর বছর কঠোর বিনিয়োগের চাপের পর রিলায়েন্স এখন আয়ের এক শক্তিশালী ঊর্ধ্বচক্রে প্রবেশ করেছে।

অবশ্য এই ৯০,০০০ কোটি টাকার নগদ প্রবাহের বিশাল সম্ভাবনার মাঝেও বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। খুচরা ও কুইক কমার্স খাতে ডার্ক স্টোর স্থাপন এবং ডেলিভারির গতি বাড়ানোর অতিরিক্ত খরচের কারণে অদূর ভবিষ্যতে খুচরা খাতের মুনাফার হার কিছুটা চাপের মুখে থাকতে পারে। এ ছাড়াও, টেলিকম খাতে মূলধনী ব্যয় হ্রাস পেলেও ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নতুন জ্বালানিতে নতুন বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে, এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে অপরিশোধিত তেলের মূল্য ওঠানামা করলে O2C সেগমেন্টের ফলাফলের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির দীর্ঘমেয়াদী কৌশল বরাবরই বৃহৎ পরিকাঠামো নির্মাণ এবং তা থেকে দীর্ঘমেয়াদী নগদ অর্থ উপার্জনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জিও-র শুরুর দিনগুলিতেও এই একই সফল মডেল দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেখানে বিগত তিন বছরের বিপুল মূলধনী বিনিয়োগের অবসান ঘটতে চলেছে এবং সংস্থাটি ৯০,০০০ কোটি টাকার মুক্ত নগদ প্রবাহ অর্জনের ঠিক দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে।