আর্জেন্টিনার জার্সি কি তবে সত্যিই খুলে ফেলছেন মেসি? অবসরের চূড়ান্ত দিনক্ষণ নিয়ে বড় আপডেট!

বিশ্বকাপের মহারণ মিটতেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে আর কতদিন দেখা যাবে জাদুকর লিওনেল মেসিকে? ৩৯ বছর বয়সেও মাঠে তাঁর রূপকথার মতো পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে যে বড় মঞ্চে এখনও তাঁর ম্যাজিক বিন্দুমাত্র মলিন হয়নি। তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে চলা জল্পনা থামার নাম নিচ্ছে না। আর এবার এই জল্পনাকে আরও জোরালো করে তুলেছে খোদ আর্জেন্টিনার বেশ কিছু প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম। স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়ে ফেলেছেন। তবে এখনই তিনি হুট করে জাতীয় দলকে বিদায় জানাচ্ছেন না। বরং আরও কিছুদিন আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠ মাতাবেন এবং দলের প্রজন্ম বদলের এই ক্রান্তিলগ্নে তরুণ ও উদীয়মান ফুটবলারদের মেন্টর হিসেবে পাশে থাকবেন। এই বিশেষ দায়িত্ব পালন শেষেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরতরে আলবিদা জানাতে পারেন।
সম্প্রতি শেষ হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপে মেসির অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স ছিল বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে তিনি দুর্দান্ত ফর্মে থেকে মোট আটটি গোল করেন এবং সতীর্থদের দিয়ে করান আরও চারটি গোল। শুধু গোল করা বা করানোই নয়, ম্যাচের পর ম্যাচ তিনি যেভাবে অসংখ্য গোলের সহজ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন, তা আধুনিক ফুটবলে বিরল। তাঁর এই ধারাবাহিক ও দাপুটে পারফরম্যান্স দেখে ফুটবল বোদ্ধাদের বড় অংশই মনে করেছিলেন যে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল তাঁরই প্রাপ্য ছিল। তবে তাঁকে সেই স্বীকৃতি না দেওয়ায় গোটা ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। এমন তুঙ্গে থাকা ফর্মের পরও কেন অবসরের কথা ভাবছেন তিনি? এর পেছনে রয়েছে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা। দলের প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি আগামী বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখে এখন থেকেই একটি শক্তিশালী ও তরুণ দল গড়ে তুলতে চান। বর্তমান বিশ্বজয়ী স্কোয়াডের বহু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের বয়সই ৩৫ বছরের বেশি। ফলে ভবিষ্যতের কথা ভেবে ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের হাতে দলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া ছাড়া কোচ ও টিম ম্যানেজমেন্টের সামনে অন্য কোনো বিকল্প খোলা নেই।
অবশ্য কোচ স্কালোনি রাতারাতি পুরো দল বদলে ফেলার কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে নারাজ। তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হলো ধাপে ধাপে নতুন প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের কঠিন মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করা। অভিজ্ঞ ও প্রবীণ খেলোয়াড়দের ঠিক পাশাপাশি রেখে তরুণদের এই বড় মঞ্চে মানিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত সুযোগ দিতে চান তিনি। সেই কৌশলী পরিকল্পনারই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মেসি আরও কিছুদিন জাতীয় দলে নিজের খেলা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন। বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, কোচ স্কালোনির সঙ্গে দীর্ঘ ও বিস্তারিত আলোচনার পরেই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন যে আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনায় নতুন ফুটবলারদের মনে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ভীষণভাবে কাজে লাগবে। তাই সবুজ মাঠের ভেতরে এবং বাইরে—উভয় জায়গাতেই তিনি তরুণ তুর্কিদের সঠিক পথ দেখাতে চান। এই মহান দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি আপাতত জাতীয় দলের সঙ্গ ছাড়ছেন না।
এদিকে নিজের সুদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত অবস্থানও অত্যন্ত পরিষ্কার করে দিয়েছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার। তিনি ইতিমধ্যেই কোচ স্কালোনিকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে আগামী ফিফা বিশ্বকাপে তাঁর খেলার আর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। অর্থাৎ, টিম ম্যানেজমেন্ট যখন পরবর্তী বিশ্বকাপের প্রাথমিক দল বা ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করবে, তখন তাঁকে সম্পূর্ণভাবে বাদ রেখেই যেন সমস্ত ছক কষা হয়। একই ধরনের স্পষ্ট বার্তা নাকি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে খোদ আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এএফএ-র শীর্ষ কর্তাদের কাছেও। এএফএ-র পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে মেসির এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে তারা সর্বোচ্চ সম্মান জানাতে প্রস্তুত। অ্যাসোসিয়েশনের অভ্যন্তরীণ সূত্রের জোরালো দাবি, মেসি যখনই নিজের মুখে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের চূড়ান্ত ঘোষণা করবেন, ঠিক তারপরেই তাঁর সম্মানে একটি বিশেষ ও ঐতিহাসিক বিদায়ী ম্যাচের জমকালো আয়োজন করা হবে। অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ সেই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার মাটিতেই হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, যাতে দেশের লক্ষ লক্ষ সমর্থকের সামনে শেষবারের মতো নীল-সাদা জার্সিতে মাঠে নেমে আবেগঘন বিদায় নিতে পারেন এই কিংবদন্তি।
সবচেয়ে স্বস্তির ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মুহূর্তে লিওনেল মেসির ওপর কোনো প্রকার অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন না কোচ কিংবা এএফএ-র শীর্ষ কর্তারাও। তিনি ঠিক কোন ক্ষণে বা কোন ম্যাচে বুট জোড়া চিরকালের মতো তুলে রাখবেন, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজস্ব স্বাধীনতার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যখনই তিনি নিজে থেকে সবুজ সংকেত দেবেন, তখনই তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় সংবর্ধনা সংক্রান্ত সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হবে। ফুটবল ইতিহাসের পাতায় মেসির অনবদ্য অবদান ইতিমধ্যেই এমন এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে যা সহজে কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। তাই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তাঁর এই বহু প্রতীক্ষিত বিদায়লগ্ন কেবল আর্জেন্টিনার নয়, গোটা বিশ্ব ক্রীড়ामुখী মানুষের জন্যই এক অত্যন্ত আবেগঘন ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে থাকবে। আপাতত দেশের অগণিত ফুটবল ভক্তদের জন্য স্বস্তির একটাই খবর যে, জাদুকর লিওনেল মেসির ফুটবল জাদু আরও কিছুদিন আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে চাক্ষুষ করা যাবে। তবে সেই সোনালী অধ্যায়ের শেষ পাতা যে আর খুব বেশি দূরে নেই, তা এখন থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে।