রাস্তায় গাড়ি রাখলেই এবার মোটা জরিমানা! কলকাতার রাতের পার্কিংয়ে বড় পদক্ষেপ পুলিশের

রাতের অন্ধকারে শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো অঘোষিত পার্কিং লটে পরিণত হওয়ার ছবি এবার চিরতরে বদলাতে চলেছে। আবাসনের সামনে, সরু গলি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি পার্কিং করে রাখার প্রবণতায় এবার কড়া আইনি লাগাম টানতে চলেছে কলকাতা পুলিশ। বিশেষ করে আসন্ন দুর্গাপুজো ও উৎসবের মরশুমকে সামনে রেখে কলকাতার রাতের পার্কিং ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হলো, বেআইনি রাতের পার্কিং চিরতরে বন্ধ করে শহরের রাস্তাকে আরও নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন এবং সম্পূর্ণ যানজটমুক্ত করে তোলা।
লালবাজারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, রাজ্য সরকারের সরাসরি নির্দেশের পরই শহরের বিভিন্ন জোনে বিশদ সমীক্ষার কাজ শুরু করে দিয়েছে কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। কোন কোন নির্দিষ্ট রাস্তায় নির্দিষ্ট ফি বা টোল নিয়ে রাতের পার্কিংয়ের বৈধ অনুমতি দেওয়া যেতে পারে এবং কোন কোন সংবেদনশীল এলাকাকে সম্পূর্ণভাবে ‘নো নাইট পার্কিং’ বা পার্কিং নিষিদ্ধ জোন হিসেবে ঘোষণা করা উচিত, তার একটি নিখুঁত ও চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই সমীক্ষার কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পরেই তালিকাটি কলকাতা পুরনিগমের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হবে। পুরনিগমের সবুজ সংকেত বা অনুমোদন পাওয়া মাত্রই পুলিশ ও পুরনিগম যৌথভাবে মেগা অভিযান শুরু করবে। প্রশাসনের কঠোর পরিকল্পনা রয়েছে যে, দুর্গাপুজোর মরশুম থেকেই এই নতুন নিয়ম কার্যকর করা হবে এবং শীতের উৎসব তথা বড়দিনের আগেই অবৈধ রাতের পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে যে, কলকাতার এমন বহু সংকীর্ণ রাস্তা রয়েছে যেখানে রাতভর গাড়ি পার্কিং করে রাখার কারণে প্রতিদিন ভোরবেলা সাধারণ যান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। বিশেষ করে হাসপাতালের আশপাশের এলাকা, ফায়ার স্টেশন বা দমকল কেন্দ্রের সংযোগকারী রাস্তা এবং জরুরি পরিষেবার সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ জোনগুলিকে চিহ্নিত করে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, শহরে হঠাৎ কোনো অগ্নিকাণ্ড, বড় দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো জরুরি স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হলে রাস্তার দুই ধারে অবৈধভাবে পার্কিং করে রাখা যানবাহনের কারণে অ্যাম্বুল্যান্স কিংবা দমকলের ইঞ্জিন সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না। এই সম্ভাব্য প্রাণঘাতী ঝুঁকি দূর করতেই পুলিশ প্রশাসন এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক দায়িত্বশীল অতিরিক্ত নগরপাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, মেট্রোপলিটন শহরকে আরও বেশি সুরক্ষিত এবং সাধারণ মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সমস্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। রাতের পার্কিংয়ের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে সুশৃঙ্খল নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। নতুন এই প্রশাসনিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুধু কোথায় গাড়ি পার্কিং করা যাবে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়াই নয়, বরং একটি গাড়ির কতক্ষণ পর্যন্ত পার্কিংয়ের বৈধতা থাকবে, তাও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট সময়ের সময়সীমা পেরিয়ে গেলে চালককে তৎক্ষণাৎ গাড়ি সরিয়ে নিতে হবে। নিয়ম অমান্য করলে মোটা অঙ্কের জরিমানা কিংবা কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশাসনের মূল্যায়ণ অনুযায়ী, বিগত কয়েক বছরে কলকাতায় ব্যক্তিগত চার চাকার গাড়ির সংখ্যা দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেলেও আবাসিক ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে সেই অনুপাতে পর্যাপ্ত গ্যারেজ বা নিজস্ব পার্কিং স্পেস তৈরি হয়নি। এর ফলেই বাধ্য হয়ে বহু মানুষ রাতভর ব্যস্ত রাস্তার ওপর গাড়ি ফেলে রাখেন। এর জেরে একদিকে যেমন সড়কের কার্যকর প্রস্থ সংকুচিত হয়ে যায়, অন্যদিকে সাধারণ পথচারী এবং অন্যান্য দূরপাল্লার গাড়িচালকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ট্রাফিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সুনির্দিষ্ট নিয়মের বেড়াজালে রাতের পার্কিং পরিচালিত হলে রাস্তা দখল করে গাড়ি রাখার স্বেচ্ছাচারিতা যেমন কমবে, তেমনই শহরের সামগ্রিক ট্রাফিক গতিশীলতা স্বাভাবিক থাকবে। সবমিলিয়ে, কলকাতার রাতের চিরচেনা ছবিতে বড়সড় বদলের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে।