উত্তরবঙ্গের জন্য একগুচ্ছ বাম্পার ঘোষণা নিশীথ প্রামাণিকের! পাহাড় থেকে ডুয়ার্স—বদল আসছে কোন কোন ক্ষেত্রে?

বিধানসভায় উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন প্রসার এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্রের আমূল পরিবর্তনে একগুচ্ছ নতুন প্রকল্পের ঘোষণা করলেন বিভাগীয় মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। এদিন বিধানসভার মঞ্চ থেকে যেমন উত্তরবঙ্গের সার্বিক উন্নয়নের ব্লু-প্রিন্ট তুলে ধরা হয়, তেমনই বিগত সরকারের আমলে উত্তরবঙ্গ যেভাবে বঞ্চনার শিকার হয়েছিল, তার তীব্র সমালোচনা করতেও ছাড়েননি তিনি।
এদিন প্রাক-বাজেট ও বাজেট আলোচনায় উত্তরবঙ্গের মানুষের বঞ্চনা প্রসঙ্গে নিশীথ প্রামাণিক বলেন, “যে উত্তরবঙ্গের মানুষের চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছিল, মানুষের মনের ব্যথা জানাবার কোনও জায়গা ছিল না, অতীতে কেবল মিথ্যে প্রতিশ্রুতি মিলেছে। রাজবংশী ও কামতাপুরী ভাষার নামে জনজাতিকে ভাগ করার চেষ্টা হয়েছে। এমনকি প্রশাসনিক বৈঠকে আমলাদের প্রকাশ্যে অপমান করার অভিযোগও অতীতে দেখা গিয়েছে।” এর বিপরীতে বর্তমান সরকারের মনোভাব স্পষ্ট করে তিনি জানান যে, এই সরকার উত্তরবঙ্গ ও সেখানকার মানুষকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ও সেতু নির্মাণ
উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে একাধিক বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী:
নতুন সেতু নির্মাণ: বর্ষার সময়ে পাহাড়ি নদীর জল বাড়লে বাঁশের সাঁকো দিয়ে যাতায়াতে সাধারণ মানুষের যে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়, তার স্থায়ী সমাধানে প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে প্রতি আর্থিক বছরে অন্তত দশটি করে নতুন সেতু নির্মাণ করা হবে।
হাইড্রোলিক পার্কিং: পাহাড়ের দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা দূর করতে দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং এবং মিরিকে আধুনিক প্রযুক্তির ‘হাইড্রোলিক পার্কিং’ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
স্বাগত তোরণ: অসম সীমান্তে রাজ্যের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলতে একটি সুদৃশ্য স্বাগত তোরণ তৈরি করা হবে।
পর্যটন শিল্পে জোয়ার ও নতুন সংযোজন
উত্তরবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে একাধিক অভিনব পদক্ষেপের ঘোষণা করা হয়েছে:
সমগ্র উত্তরবঙ্গ জুড়ে ১০০টি পর্যটন তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যেখানে একই ছাদের নিচে কফি স্টল, হোমস্টে এবং ফুড প্লাজার সুবিধা পাবেন পর্যটকরা। ডুয়ার্স ও পাহাড়ের পাশাপাশি গৌড়বঙ্গকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সান্দাকফু এলাকার পর্যটকদের সূর্যোদয় দেখার অভিজ্ঞতা আরামদায়ক করতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ‘কন্টেইনার হোম’ তৈরি করবে সরকার।
চলচ্চিত্র নির্মাতাদের শুটিংয়ের অনুমতি ও যাবতীয় সরঞ্জাম পেতে এক ছাতার নিচে ‘সিঙ্গেল উইন্ডো সলিউশন’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য, বাণিজ্য ও ক্রীড়া পরিকাঠামো
স্বাস্থ্য: দার্জিলিঙে একটি আধুনিক ‘ইমার্জেন্সি ট্রমা কেয়ার সেন্টার’ তৈরি করা হবে। পাশাপাশি আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে নতুন মেডিক্যাল কলেজ গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাণিজ্য ও কৃষি: পানিট্যাঙ্কি, জয়গাঁ, হিলি, চ্যাংড়াবান্ধা ও ফুলবাড়ীতে অত্যাধুনিক স্থলবন্দর গড়ে তোলা হবে। মালদহে কৃষিনির্ভর শিল্পের প্রসারে বহুমুখী হিমঘর তৈরি হবে, যেখানে আম ও আনারস সংরক্ষণের জন্য ফুড প্রসেসিং ইউনিট থাকবে।
সংস্কৃতি ও ক্রীড়া: ভাওয়াইয়া, খন ও গম্ভীরা গান সংরক্ষণের জন্য একটি বিশেষ একাডেমি তৈরি করা হবে। মালদহের চাঁচল বা গাজোলে মিনি স্পোর্টস সেন্টার অফ এক্সিলেন্স এবং প্রতিটি জেলায় ইন্ডোর স্টেডিয়াম গড়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও বিগত আমলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়ে মন্ত্রী জানান, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশমতো দুর্নীতিগ্রস্ত ১২২টি এজেন্সিকে ইতিমধ্যেই শোকজ ও কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতেই বাজেটে প্রতিটি বিধানসভার জন্য সমান অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। পরিশেষে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত বিধায়ককে এলাকার উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে নিশীথ প্রামাণিক বলেন, “আপনাদের যে কোনও সমস্যার জন্য সবসময় দরজা খোলা রয়েছে। আপনারা উন্নয়নমূলক কাজের প্রস্তাব নিয়ে এলে তা বাস্তবায়িত করার জন্য আমি নিজে মন থেকে চেষ্টা করব।”