ভিজে কফি হাউস আর কলেজ স্ট্রিটের নস্টালজিয়া! মঞ্চ কাঁপাতে আসছে অঞ্জন-অমিত-নীলের ‘ডি-ট্রিয়ো’, মিস করবেন না এই ম্যাজিক

আজকের কলকাতা যতই আধুনিকতার মোড়কে বদলে যাক না কেন, কিংবদন্তি শিল্পী অঞ্জন দত্তের গলার একটি মাত্র গান শুনলেই আজও যেন চোখের পলকে ভিজে ওঠে কলেজ স্ট্রিটের চেনা ফুটপাত, কফি হাউসের অন্তহীন আড্ডা আর জীবনের প্রথম প্রেমের অমলিন স্মৃতি। এই চিরন্তন আবেগ ও নস্টালজিয়াকে কলকাতার বুকে ফের একবার জীবন্ত করে তুলতে আসছে এক অভিনব আয়োজন। অঞ্জন দত্তের সঙ্গে মঞ্চ মাতাতে থাকছেন অমিত দত্ত এবং নীল দত্ত। এই তিন প্রতিভাধর তারকাকে এক ফ্রেমে বেঁধে তৈরি হয়েছে বিশেষ মিউজিক্যাল প্রজেক্ট ‘ডি-ট্রিয়ো’ (D-Trio)। নাট্যদল ‘বেপরোয়া’-র উদ্যোগে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এই মেগা মিউজিক্যাল ইভেন্ট, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘একদিন বৃষ্টিতে…’।

অঞ্জন দত্তর গান মানেই সাধারণ মানুষের কাছে শুধু গতানুগতিক নস্টালজিয়া নয়। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে কলকাতার অলিগলি, কলেজজীবনের প্রথম প্রেম, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং এই মহানগরের নিজস্ব এক স্বতন্ত্র চরিত্র। সেই পরিচিত ও প্রিয় অনুভূতিকেই সম্পূর্ণ নতুন এক নান্দনিক মোড়কে মঞ্চে তুলে ধরার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে নাট্যদল বেপরোয়া। দলটির সম্পাদক কৌস্তভ রায় জানিয়েছেন যে, এই মহোৎসবের পেছনে মূলত দুটি সুদূরপ্রসারী ও গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা কাজ করছে। এর মধ্যে প্রথমটি অত্যন্ত অভিনব এবং তা সরাসরি নাট্যচর্চার অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। তাঁর মতে, দেশের অধিকাংশ নাট্যদল সাধারণত একটি নাটক প্রযোজনা করে এবং সেই নাটকের টিকিটের আয়ের ওপর ভর করেই পরবর্তী খরচ তোলার চেষ্টা করে। এর ফলে বহু ক্ষেত্রেই দর্শক বা বাজারের নির্দিষ্ট চাপের কাছে আপস করতে হয় এবং শিল্পের আসল মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

বেপরোয়া দল সেই গতানুগতিক পথে হাঁটতে নারাজ। তাই তারা স্থির করেছে যে, প্রতি মরশুমে অন্তত দুটি বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেমন জমজমাট কনসার্ট বা উচ্চমানের কবিতা পাঠের আয়োজন করা হবে। সেই সমস্ত অনুষ্ঠান থেকে যে আর্থিক লাভ আসবে, তা সরাসরি দলের মূল নাট্যচর্চায় বিনিয়োগ করা হবে। অর্থাৎ শিল্পের বিকাশকে টিকিয়ে রাখার জন্য শিল্পেরই অন্য একটি সৃজনশীল মাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে চাইছে তারা। শুধু তাই নয়, এই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাইরেও এই আয়োজনের একটি সুগভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। কৌস্তভ রায়ের মতে, কলকাতাকে তাঁরা কেবল ট্রাম, হলুদ ট্যাক্সি, পুরনো হেরিটেজ বাড়ি বা নিছক স্মৃতির শহর হিসেবে দেখতে চান না। তাঁদের কাছে এই মহানগর এমন এক বহুত্ববাদী সমাজ, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, ইহুদি এবং চাইনিজ সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে একসঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার এক অনন্য ইতিহাস তৈরি করেছেন। আর সেই বহুস্বরের কলকাতা অঞ্জন দত্তর গানে বারবার অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।

‘জেরেমির বেহালা’, ‘ডিগামার কেক’ কিংবা জনপ্রিয় গান ‘আলিবাবা’-র মতো সৃষ্টিগুলিতে যেভাবে শহরের সাধারণ মানুষের যাপনের গল্প ধরা পড়ে, ঠিক তেমনই কলকাতার ভিন্ন সংস্কৃতি, শহুরে সংগ্রাম এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বাস্তব ছবিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই কারণেই বেপরোয়ার দৃঢ় বিশ্বাস যে, অঞ্জন দত্তর গানকে মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেই কলকাতার আসল ও অকৃত্রিম নির্যাসকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব। শুধু একটি কনসার্ট করেই ক্ষান্ত থাকতে চাইছে না এই নাট্যদল, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আরও অনেকদূর বিস্তৃত। অঞ্জন দত্তর সুদীর্ঘ চোখে দেখা কলকাতা, এই শহরের সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং শিল্পীজীবনের অমূল্য স্মৃতিগুলিকে ক্যামেরাবন্দি করে চিরতরে সংরক্ষণ করার মহৎ লক্ষ্য নিয়েছে তারা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ঐতিহাসিক আর্কাইভ তৈরি করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।

তাহলে এই বিশেষ আয়োজনের জন্য কেন বারবার ঘুরেফিরে অঞ্জন দত্তের নামই সামনে এল? এই প্রশ্নের অত্যন্ত স্পষ্ট ও যুক্তিযুক্ত উত্তর দিয়েছেন কৌস্তভ রায়। তাঁর মতে, থিয়েটার, গান এবং সিনেমা—শিল্পের এই তিনটি প্রধান ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিনের বিচরণ ও অভিজ্ঞতার ঝুলি রয়েছে অঞ্জন দত্তর। জীবনের শুরুতে তিনি সাংবাদিকতার পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে বাদল সরকারের মতো কিংবদন্তি নাট্যব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে কলকাতাকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার এবং এই শহরের মনস্তত্ত্বকে বোঝার এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। সেই জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতাই তাঁকে এই কাজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত করে তুলেছে। তবে এই গোটা আয়োজনের সঙ্গে শুধুমাত্র পেশাদারি পরিকল্পনা বা কৌশলগত চিন্তাভাবনা জড়িত নেই, এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে দলের প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিগত আবেগ ও ভালোলাগা। বেপরোয়ার বেশিরভাগ সদস্যই শৈশব ও কৈশোর থেকে অঞ্জন দত্তর গানের একনিষ্ঠ ভক্ত। সেই শৈশবের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘একদিন বৃষ্টিতে…’। আগামী দিনে এমন এক জাদুকরি সন্ধ্যার সাক্ষী থাকতে চলেছে কলকাতা, যেখানে কেবল গান শোনা হবে না, বরং ফিরে দেখা হবে সেই চিরকালের কলকাতাকে—যে শহর এখনও মানুষের স্মৃতিতে, সুরের মূর্ছনায় এবং অঞ্জন দত্তর গানে সমানভাবে বেঁচে রয়েছে।