এড়ানো গেল পিএসি ভোট! বিধানসভায় শাসক-বিরোধী সমঝোতায় কোন সমীকরণে নাম জমা দিল তৃণমূল?

রাজ্য বিধানসভায় দীর্ঘ জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এড়ানো গেল বহুল আলোচিত পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি বা PAC নির্বাচন। এদিন বিধানসভায় শাসক ও বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে মোট ২০ জনের নাম জমা পড়েছে। রাজনৈতিক মহলের খবর অনুযায়ী, বিরোধী তথা শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে সর্বমোট ৬টি নাম জমা দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে কালীঘাট শিবির থেকে নাম জমা পড়েছে ১ জনের এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির থেকে জমা পড়েছে বাকি ৫ জনের। প্রথা অনুযায়ী পিএসি বা পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান পদটি ঐতিহ্যগতভাবে বিরোধী দলের কোনো বিধায়ককে দেওয়ার কথা থাকলেও, গত বিধানসভার মেয়াদে তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিগত বিধানসভায় বিরোধী শিবিরকে পিএসি চেয়ারম্যানের পদ দেওয়া হয়নি, যা ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক শোরগোল পড়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন কোন বিধায়ক এই গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্য হতে চলেছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তুঙ্গে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের তরফে পিএসি কমিটির জন্য যাঁদের নাম জমা পড়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রবীণ নেতা বিপ্লব মিত্র, হেভিওয়েট মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, গোলাম রাব্বানী, কানাইয়া লাল আগরওয়াল এবং সমর মুখার্জি। অন্যদিকে, কালীঘাট তৃণমূলের পক্ষ থেকে একমাত্র অশোক দেবের নাম জমা দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত parliamentary প্রথা এবং বিধানসভার নিয়ম অনুযায়ী, এই ৬ জনের মধ্য থেকেই কাউকে একজন পিএসি-র চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, অতীতে মুকুল রায়কে ঘিরে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি বা PAC নিয়ে যে নজিরবিহীন বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা আজও রাজনৈতিক মহলে চর্চায় থাকে। ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মুকুল রায় ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) টিকিটে কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছিলেন। কিন্তু ভোটের ফল প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বিজেপি ছেড়ে শাসকদল তৃণমূলে ফিরে আসেন। যদিও তিনি তৎকালীন সময়ে তাঁর বিধায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেননি এবং বিধানসভার দাপ্তরিক নথিতে তিনি কাগজে-কলমে বিজেপি বিধায়ক হিসেবেই বহাল ছিলেন। এরপরেই ২০২১ সালের জুলাই মাসে বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (PAC)-র চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ করেন, যা ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে চরম বিতর্কের সূত্রপাত হয়।

বিজেপির পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলা হয়েছিল যে, পিএসি-র চেয়ারম্যান পদটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী প্রথাগতভাবে বিরোধী দলের কোনো সদস্যের প্রাপ্য। মুকুল রায় কার্যত তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরেও তাঁকে এই পদের প্রধান করা সম্পূর্ণভাবে সংসদীয় রীতির পরিপন্থী। এই পদে বিজেপি তাদের বিশিষ্ট বিধায়ক তথা প্রবীণ অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ীর নাম প্রস্তাব করলেও স্পিকার তা গ্রাহ্য করেননি, যার প্রতিবাদে বিজেপি বিধায়করা বিধানসভা থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন। অন্যদিকে, তৃণমূলের সাফাই ছিল যে মুকুল রায় তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিধায়ক পদ ছাড়েননি এবং স্পিকারের কাছে তাঁর দলত্যাগ সংক্রান্ত অযোগ্যতা প্রমাণিত হয়নি, ফলে বিধানসভার সমস্ত নিয়ম মেনেই তাঁকে এই পদে মনোনীত করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলে এবং ২০২২ সালে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মুকুল রায় নিজেই পিএসি চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে কলকাতা হাইকোর্ট দলত্যাগ সংক্রান্ত মামলায় মুকুল রায়কে বিধায়ক পদে অযোগ্য ঘোষণা করে এবং তাঁর তৎকালীন পিএসি চেয়ারম্যানের মনোনয়নও খারিজ করে দেয়। যদিও ২০২৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই অযোগ্যতার রায়ের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করে।