বিশ্বকাপের পর্দা নামতেই ফিফার মেগা ঘোষণা! একাদশে জায়গা পেয়েও বাদ পড়লেন কে?

দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এবং ১০৪টিুদ্ধ ম্যাচের আকর্ষণীয় রোমাঞ্চের পর অবশেষে পর্দা নেমেছে ফুটবল বিশ্বকাপের (FIFA World Cup)। বিশ্বমঞ্চে ৮টি দল একে অপরের বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে অংশ নেয়। টুর্নামেন্টজুড়ে যেমন বিশ্ব ফুটবলের সমস্ত প্রতিষ্ঠিত তারকারা নিজেদের অসাধারণ সামর্থ্যের চূড়ান্ত প্রমাণ দিয়েছেন, ঠিক তেমনই বিশ্ববাসী সাক্ষী থেকেছে একাধিক নতুন মুখের অভাবনীয় প্রতিভার। কেউ গোল করে, কেউ রক্ষণ দুর্গ আগলে রেখে, আবার কেউ মাঝমাঠের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে গোটা ফুটবল বিশ্বের মন জয় করে নিয়েছেন। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক পরেই এবার টুর্নামেন্টের সেরা পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের অফিশিয়াল ‘টিম অফ দ্য টুর্নামেন্ট’ বা সেরা একাদশ প্রকাশ করেছে ফিফা।
গোলরক্ষকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে জায়গা করে নিয়েছেন কেপ ভার্দের তারকা ভোজিনহা। গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল অবিশ্বাস্য এবং বলাই বাহুল্য, তাঁর করা একের পর এক দুরন্ত সেভই কার্যত একাই অখ্যাত কেপ ভার্দেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তুলেছিল। এমনকি বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন শক্তিশালী স্পেন দলও তাঁর দুর্ভেদ্য প্রাচীরের সামনে গোল করতে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছে। রাউন্ড অফ ৩২-এর হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কেপ ভার্দে যে দলের খেলা অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল, তার পেছনেও গোলরক্ষক ভোজিনহার অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।
রক্ষণভাগের চার সদস্যের মধ্যে দুই জায়গাতেই আধিপত্য বিস্তার করেছে স্পেন। রক্ষণ অর্গানাইজেশনের ডানদিকে দুর্দান্ত পেদ্রো পোরো এবং বাঁদিকে মারকুটে মার্ক কুকুরেয়া সেরা একাদশে জায়গা পেয়েছেন। দুই ফুল-ব্যাকই পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে আক্রমণ ও রক্ষণ—উভয় দায়িত্বই সমান দক্ষতায় সামলেছেন। বিশেষ করে সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে পেদ্রো পোরোর করা দারুণ গোলটি স্পেনকে সোজা ফাইনালে পৌঁছে দেওয়ার পথে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেয়। অন্যদিকে, কুকুরেয়া তাঁর নিখুঁত ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের সুবাদে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই দলের অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
সেন্টার-ব্যাক পজিশনে নির্বাচিত হয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী রক্ষণভাগের স্তম্ভ লিসান্দ্রো মার্টিনেজ এবং ফরাসি প্রাচীর দায়োত উপমেকানো। এই দু’জনেই নিজেদের দলের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী রক্ষণ দুর্গ গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রতিটি কঠিন ম্যাচে নিজেদের পরিপক্ব অভিজ্ঞতার দারুণ পরিচয় দিয়েছেন। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান ফুটবলারের খেতাব জেতা স্পেনের অন্যতম প্রতিভাবান তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবারসি ফিফার এই সেরা একাদশে জায়গা না পাওয়ায় ফুটবল বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশ বেশ বিস্মিত হয়েছেন।
মাঝমাঠের লড়াইয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তিন বিশ্বমানের তারকা। স্পেনের তারকা রদ্রি গোল বা অ্যাসিস্টের খাতায় খুব একটা জোরালোভাবে আলোচনায় না থাকলেও, পুরো দলের ট্যাকটিক্যাল ছন্দ এবং খেলার গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন অসাধারণ বুদ্ধিমত্তায়। ফ্রান্সের মাইকেল ওলিস টুর্নামেন্টে মোট পাঁচটি নিখুঁত অ্যাসিস্ট করে নিজেকে এই প্রজন্মের অন্যতম সেরা সৃজনশীল মিডফিল্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা জুড বেলিংহ্যাম মাঝমাঠ থেকে একাই সাতটি গোল করে গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে আধুনিক ফুটবলে মিডফিল্ডাররাও যেকোনো ম্যাচের ভাগ্য এক নিমেষে নির্ধারণ করতে পারেন।
আক্রমণভাগের তিন মহাতারকার নাম বরাবরের মতোই আলো কেড়েছে। সময়ের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি আরও একবার বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র। আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে পৌঁছে দেওয়ার দীর্ঘ লড়াইয়ে গোল করা, গোল করানোর অ্যাসিস্ট এবং দুর্দান্ত নেতৃত্ব—প্রতিটি বিভাগেই তাঁর অবদান ছিল ঐতিহাসিক ও অনস্বীকার্য। তাঁর এই আক্রমণভাগে সঙ্গী হয়েছেন ফ্রান্সের গতিদানব কিলিয়ান এমবাপে, যিনি একাই ১০টি গোল এবং ৪টি চমৎকার অ্যাসিস্ট করে মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন বুট’ নিজের নামে করেছেন। পুরো বিশ্বকাপে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে ধারাবাহিক ও ভয়ংকর ফরোয়ার্ড। এছাড়া তৃতীয় স্ট্রাইকার হিসেবে জায়গা পেয়েছেন নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। টুর্নামেন্টে মোট সাতটি গোল করার পাশাপাশি নরওয়েকে একা হাতে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর সামগ্রিক প্রভাবই তাঁকে এই বিশেষ সম্মান এনে দিয়েছে।
ফিফার ঘোষিত এই অফিসিয়াল সেরা একাদশে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য রয়েছে দুই ফুটবল পরাশক্তি স্পেন ও ফ্রান্সের। উভয় দেশেরই তিনজন করে ফুটবলার এই সম্মানজনক একাদশে জায়গা করে নিয়েছেন। রানার্স আপ আর্জেন্টিনা থেকে রয়েছেন দু’জন প্রতিনিধি, আর বাকিদের মধ্যে ইংল্যান্ড, নরওয়ে ও কেপ ভার্দে থেকে একজন করে ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছেন। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ফিফার প্রকাশিত বিশ্বকাপের সেই চূড়ান্ত সেরা একাদশ: গোলরক্ষক হিসেবে ভোজিনহা; রক্ষণভাগে পেদ্রো পোরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, দায়োত উপমেকানো ও মার্ক কুকুরেয়া; মাঝমাঠে রদ্রি, মাইকেল ওলিস ও জুড বেলিংহ্যাম এবং আক্রমণভাগে লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে ও আর্লিং হালান্ড।