পুলিশি লাঠিচার্জ থেকে সংসদ অভিযান, নিট পরীক্ষা কেলেঙ্কারিতে কোণঠাসা কেন্দ্র, উত্তাল জাতীয় রাজনীতি!

দেশজুড়ে নিট (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার চরম অনিয়মের অভিযোগে দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র নেতৃত্বে চলা আন্দোলন এখন এক নজিরবিহীন ও অগ্নিগর্ভ রূপ ধারণ করেছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ এবং প্রশ্নফাঁসের জেরে আত্মঘাতী পড়ুয়াদের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবিতে ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি একযোগে রাজপথে নেমেছে। এই আন্দোলন আর কেবল সাধারণ ছাত্র বিক্ষোভের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি এক বিস্তৃত জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

দিল্লিতে সংসদ ভবন অভিযানের চেষ্টা, যন্তর মন্তরে অবস্থান বিক্ষোভ, পুলিশি লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, জলকামান প্রয়োগ এবং আন্দোলনকারী বিশিষ্ট নেতা সোনম ওয়াংচুকের অনশন ও পরবর্তীকালে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনায় গোটা দেশ এক রাজনৈতিক তোলপাড়ের সাক্ষী থাকছে। পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়েছিল গত ২০ জুলাই, যখন আন্দোলনকারীরা দিল্লির রাস্তায় ‘চলো সংসদ’ অভিযানের ডাক দিয়ে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে যন্তর মন্তরে জমা হন। যন্তর মন্তরে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বিপুল জমায়েত তৈরি হওয়ায় সংলগ্ন তলক মার্গ এবং সংসদ মার্গ স্তব্ধ হয়ে পড়ে এবং চরম যানজটের সৃষ্টি হয়। এই ভিড়ের মধ্যেই হাতাহাতি শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং দফায় দফায় টিয়ার গ্যাসের সেল ফাটায়। এই সংঘর্ষের জেরে দুই সহকারী পুলিশ কমিশনার (ACP) সহ মোট ৬ জন পুলিশকর্মী এবং বহু আন্দোলনকারী জখম হয়েছেন।

ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপ পুলিশের বিরুদ্ধে চরম দমনপীড়নের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, পুলিশ নিরীহ আন্দোলনকারীদের ওপর অমানবিক লাঠিচার্জ করেছে এবং আন্দোলন স্তব্ধ করতে যন্তর মন্তর সংলগ্ন গোটা এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। অন্যদিকে, এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সামাল দিতে মুখ খুলেছেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা। তিনি জানিয়েছেন, সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রেখেছে, তবে শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে অনড় পক্ষগুলির সঙ্গে এখনও কোনো সমঝোতা হয়নি। এর সঙ্গেই বিরোধী দলগুলিকে এই স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে রাজনীতি না করার পরামর্শ দিয়েছেন নাড্ডা।

তবে সিজেপি (CJP) তাদের অবস্থানে অনড় থেকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে কোনো বন্ধ ঘরে বা একতরফা বৈঠক চলবে না। আলোচনা হতে হবে নিরপেক্ষ স্থানে অথবা সরাসরি যন্তর মন্তরের আন্দোলন মঞ্চে এবং লিখিত প্রস্তাব না মিললে তারা আলোচনায় বসবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এরই মধ্যে ঘোষণা করেছেন যে নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে জড়িত দোষীদের দ্রুত কঠোর শাস্তি দিতে ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠন করা হবে। অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা এবং কে সি ভেনুগোপাল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভ দেখান এবং সংসদেও বিরোধী সাংসদরা কালো পোশাক পরে প্রতিবাদে সামিল হন। বিরোধী প্রতিনিধি দল হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান।

পুলিশি অতিসক্রিয়তা ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জল অবশেষে গড়িয়েছে আদালতেও। গত ২০ জুলাইয়ের প্রতিবাদ চলাকালীন আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের চড়াও হওয়ার অভিযোগে দিল্লি হাইকোর্টে দায়ের করা মামলার শুনানিতে আদালত কেন্দ্র সরকার, দিল্লি পুলিশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (NHRC) নোটিস জারি করেছে। আদালত অত্যন্ত কড়া ভাষায় নির্দেশ দিয়েছে যে ২০ জুলাই রাতের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও রেকর্ডিং সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ১১ সেপ্টেম্বর ধার্য করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে মেদান্তা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সোনম ওয়াংচুক শিক্ষার্থীদের সংযমের প্রশংসা করে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আন্দোলনকারী তরুণদের বিরুদ্ধে কোনো এফআইআর, গ্রেপ্তার বা আইনি হেনস্থা করা হবে না – সরকারের তরফ থেকে এই লিখিত নিশ্চয়তা মিললেই কেবল তিনি তাঁর অনশন প্রত্যাহার করবেন।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty