বাদল অধিবেশনেই চরম বিস্ফোরণ! নিট কাণ্ড ও মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল সংসদ থেকে যন্তর মন্তর!

চলমান বাদল অধিবেশনের একেবারে প্রারম্ভিক লগ্নেই দেশজুড়ে নিট-ইউজি (NEET-UG) প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ড এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার তীব্র অনিয়ম ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। সংসদের অন্দরের মকর দ্বার থেকে শুরু করে খাস দিল্লির যন্তর মন্তরের উন্মুক্ত রাজপথ—সর্বত্রই এখন কেন্দ্র সরকার বনাম বিরোধী শিবিরের মধ্যে এক জোরদার সংঘাত, রাজনৈতিক তরজা এবং লাগাতার পাল্টা প্রতিবাদের ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত আমূল সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগের সুনির্দিষ্ট দাবিতে যন্তর মন্তরের রাজপথে নিজেদের সুদীর্ঘ ও জোরালো অবস্থান বিক্ষোভ অত্যন্ত কঠোরভাবে জারি রেখেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র সমর্থক ও কর্মীরা। এই গণ-আন্দোলনের অংশ হিসেবেই গত ২৮ জুন থেকে একটানা আমরণ অনশন চালিয়ে যাওয়া বিশিষ্ট ও প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক সম্প্রতি এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও জীবনমুখী বার্তা দিয়েছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, গত ২০ জুলাই রাজধানীতে অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত ‘চলো সংসদ’ অভিযানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র ও যুবসমাজকে যদি কেন্দ্র সরকার বা প্রশাসন সম্পূর্ণ আইনি সুরক্ষা প্রদান করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা পুলিশি মামলা না করার একটি সুনির্দিষ্ট ও লিখিত আশ্বাস দেয়, তবেই তিনি তাঁর এই দীর্ঘ অনশন প্রত্যাহার করার কথা বিবেচনা করবেন।

দিল্লির রাজপথের এই পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক উত্তাপ এবং বিক্ষোভের আঁচ সরাসরি এসে আছড়ে পড়েছে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা তথা সংসদ ভবনের অন্দরেও। একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ও টেক্কা দেওয়ার লক্ষ্যে সংসদ চত্বরের নির্ধারিত মকর দ্বারের সামনে মুখোমুখি বিক্ষোভে শামিল হতে দেখা গেছে শাসক ও বিরোধী শিবিরের সাংসদদের। বিরোধীদের তীব্র ও আক্রমণাত্মক তোপ দেগে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরার নেতৃত্বে বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের সাংসদরা দেশব্যাপী সংঘটিত এই নজিরবিহীন প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে কেন্দ্রীয় সরকারের চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে অত্যন্ত জোরালো স্লোগান দেন। তাদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দাবি করা হয়েছে যে, নৈতিক দায়িত্ব স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রীকে অবিলম্বে নিজের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হবে এবং দেশের লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, এই বিরোধীদের আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতে ময়দানে নামে ক্ষমতাসীন এনডিএ (NDA) জোটের সাংসদরাও। সম্প্রতি দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের ঠিক নিকটবর্তী চত্বরে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে যে হঠকারী ও আচমকা অবস্থান বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছিল, তারই তীব্র প্রতিবাদে সোচ্চার ও মুখর হতে দেখা যায় শাসক দলের সমস্ত মাননীয় সাংসদদের।

ছাত্র আন্দোলন ও বিরোধী দলগুলির এই ক্রমবর্ধিষ্ণু রাজনৈতিক চাপ এবং লাগাতার আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে দেশবাসীকে উপযুক্ত আইনি ভরসা ও নিরাপত্তা দিতে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশের উদীয়মান যুবসমাজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখাকেই প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (X)-এ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, “আমাদের দেশের যুবসমাজের সামগ্রিক কল্যাণ ও তাঁদের সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো বিষয় হতে পারে না। প্রশ্নফাঁসের মতো ন্যক্কারজনক অপরাধের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত অপরাধীদের অত্যন্ত দ্রুত ও সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা বিশেষ ‘ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট’ গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। সংশ্লিষ্ট সমস্ত প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে এই মর্মে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই বার্তায় আরও এক কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, দেশের তরুণ পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস দেখানো কোনো অপরাধীকে বিন্দুমাত্র রেহাই দেওয়া হবে না।

তবে দেশের প্রধানমন্ত্রীর এই প্রশাসনিক আশ্বাস সত্ত্বেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এবং রাজপথে লড়াই চালিয়ে যাওয়া আন্দোলনকারী ছাত্র সংগঠনগুলি কিন্তু তাদের পূর্বনির্ধারিত দাবিতে এখনও পুরোপুরি অনড় ও অবিচল রয়েছে। একদিকে বিচারালয় গঠন ও ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের আইনি প্রতিশ্রুতির কথা বলছে প্রশাসন, আর অন্যদিকে অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও পড়ুয়াদের সুরক্ষার দাবিতে রাজপথের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে—সব মিলিয়ে চলমান বাদল অধিবেশনের ঠিক প্রারম্ভিক মুহূর্তে দিল্লির সমগ্র রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক চরম উত্তেজনাকর এবং জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty