এককালের ছাত্র আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ মুখ থেকে আজকের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী—ধর্মেন্দ্র প্রধানের জীবনের এই অবিশ্বাস্য চক্রব্যূহ কী ইঙ্গিত দেয়?

বছরটা ছিল ১৯৯৭। ওড়িশায় তৎকালীন কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী জানকী বল্লভ পটনায়কের রাজত্বকাল। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের একেবারে অদূরে রাজপথে প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল প্রায় ১,৫০০ বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী। তাদের এই বিশাল জমায়েতের মূল কারণ ছিল একটিই—সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস। সেদিন সেই ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের একদম সামনের সারিতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন এক তরুণ এবং লড়াকু ছাত্রনেতা—ধর্মেন্দ্র প্রধান।

সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় শিক্ষার্থী পরিষদ বা এবিভিপির তৎকালীন জাতীয় সম্পাদক হিসেবে উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের ছাত্র ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজে এই আন্দোলনের সর্বময় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর প্রাক্তন সহপাঠী এবং ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীদের স্মরণ অনুযায়ী, তৎকালীন সচিবালয়ের ঠিক সামনে সেই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে ওড়িশা পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জে তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এমনকি পুলিশের আক্রমণে তাঁর হাড় পর্যন্ত ভেঙে গিয়েছিল। ছাত্র রাজনীতির শুরুর দিনগুলিতে এমন একাধিক প্রাণঘাতী আক্রমণ ও প্রশাসনিক দমনপীড়নের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও তিনি পিছিয়ে আসেননি, বরং প্রত্যয়ের সঙ্গে সংগঠনকে শক্তিশালী করে তোলার কাজ নিরলসভাবে চালিয়ে গেছেন।

পরবর্তীকালে ছাত্র আন্দোলনের সেই সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতাই ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ধীরে ধীরে ভারতীয় জনতা পার্টির শীর্ষ স্তরে পৌঁছে দেয়। কেন্দ্রীয় সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক থেকে শুরু করে দক্ষতা উন্নয়ন এবং বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রকের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন তিনি। ওড়িশা রাজ্যে দীর্ঘ চব্বিশ বছরের নবীন পট্টনায়কের বিজেডি শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে রাজ্যে বিজেপির প্রথম ঐতিহাসিক সরকার গঠনের নেপথ্যে তাঁর বহু বছরের সুদীর্ঘ সাংগঠনিক অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

তবে ইতিহাস মাঝে মাঝে অত্যন্ত অদ্ভুত এবং নির্মম এক বৃত্ত রচনা করে। যে ভয়াবহ প্রশ্নফাঁসের অনৈতিকতার বিরুদ্ধে রাজপথে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করে ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক জীবনের বর্ণময় উত্থান হয়েছিল, আজ প্রায় তিন দশক পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি নিজেই ঠিক সেই একই ধরনের প্রশাসনিক সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে আলোচিত নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং লাগাতার দুর্নীতির অভিযোগে গোটা দেশজুড়ে এক চরম রাজনৈতিক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

নতুন দিল্লির রাজপথে আন্দোলনরত হাজার হাজার পরীক্ষার্থী ও ছাত্রছাত্রীদের ওপর পুলিশের কঠোর লাঠিচার্জ এবং টিয়ার গ্যাস প্রয়োগের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পরিস্থিতি বর্তমানে আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এই সংঘর্ষের জেরে বহু শিক্ষার্থী গুরুতর জখম হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যার মধ্যে একুশ বছরের এক তরুণী অত্যন্ত সংকজনক অবস্থায় আইসিইউ-তে লড়াই চালাচ্ছেন।

এই নজিরবিহীন ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের সমস্ত বিরোধী দলগুলি কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে সহ বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের হেভিওয়েট নেতাদের স্পষ্ট দাবি, নিট বিতর্ক নিয়ে সংসদে তর্কের আগেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে নিজের পদ থেকে ইস্তফা দিতে হবে। অন্যদিকে, বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা এবং সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে সরকার এই স্পর্শকাতর বিষয়ে যেকোনো ধরনের আলোচনার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে এবং তাদের লুকোনোর কিছু নেই।

একসময়ে যিনি নিজেই রাজপথে নেমে প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিবাদ করেছিলেন, সেই প্রাক্তন ছাত্রনেতা আজ শাসনব্যবস্থার একদম শীর্ষে বসে কীভাবে এই নজিরবিহীন সঙ্কট অত্যন্ত সুকৌশলে সামাল দেন, এখন সেটাই দেশের রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় এবং গভীর চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।