সৌদি আরবের সাথে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি আমেরিকার! মধ্যপ্রাচ্যে কি তবে যুদ্ধের মধ্যেই নতুন অস্ত্রের খেলা শুরু?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরব একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রভাবশালী দেশটি নিজেদের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার অভাবনীয় সুযোগ লাভ করতে চলেছে। আমেরিকার জ্বালানি মন্ত্রণালয় এই নতুন চুক্তিটিকে একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেছে। ওয়াশিংটনের মতে, এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সৌদি আরবের পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত করবে। তবে চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত বিষয়বস্তু এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, আমেরিকার দিক থেকে এটি একটি সম্পূর্ণ নজিরবিহীন পদক্ষেপ, যা ইতোমধ্যে চরম অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রকাশিত অফিসিয়াল বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, এই সহযোগিতা চুক্তির পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই দুটি কৌশলগত চুক্তি একসঙ্গে মিলে আগামী কয়েক দশকব্যাপী বহু বিলিয়ন ডলারের একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্বের সুদৃঢ় আইনি ভিত্তি তৈরি করবে। যা একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ এবং একাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্যকে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাবে। অন্যদিকে, সৌদি সরকারও একটি পৃথক বিবৃতি জারি করে জানিয়েছে যে, এই চুক্তিটি মূলত জ্বালানি খাতে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিদ্যমান সহযোগিতারই একটি স্বাভাবিক সম্প্রসারণ মাত্র। উল্লেখ্য, গত নভেম্বর মাসে সৌদি শীর্ষ নেতৃত্বের অত্যন্ত সফল ওয়াশিংটন সফরের ঠিক পরপরই এই বহুকাঙ্ক্ষিত চুক্তিটি সম্পন্ন হলো। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতি যখন অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করেছে, ঠিক সেই স্পর্শকাতর মুহূর্তেই এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণাটি প্রকাশ্যে এলো।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্র সৌদি আরবের ভূখণ্ডে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেগুলো বর্তমান উত্তেজনার সময়ে সরাসরি ইরানি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, ইয়েমেনের ইরানপন্থী সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিরা যখন লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কঠোর নৌ-পথ অবরোধের ঘোষণা দিল, ঠিক তার দুই দিন পরেই এই পারমাণবিক চুক্তির ঘোষণা আসায় আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জনসমক্ষে আনা না হলেও, এর আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, আমেরিকার সঙ্গে যৌথ পর্যালোচনার পরেই হয়তো সৌদি আরবকে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের ভূখণ্ডেই মার্কিন প্রযুক্তিতে নির্মিত কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বিশেষ অনুমতি দেওয়া হতে পারে। এই সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শত শত কোটি ডলারের বিশাল ব্যবসার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে, কারণ এই পারমাণবিক চুল্লি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কেন্দ্র নির্মাণ প্রক্রিয়ায় আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকবে।
উল্লেখ্য যে, এই একই ইউরেনিয়াম একদিকে যেমন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা সম্ভব, তেমনই অন্যদিকে এটি ভয়াবহ পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজেও অত্যন্ত অপরিহার্য উপাদান। এই পুরো পরিস্থিতি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে আশঙ্কা করেছেন যে, এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে গোপন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকেই ধাবিত করতে পারে। যদিও অনেক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদী পথ বাস্তবায়নে বেশ কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি বিরোধিতা আসার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন গবেষণা সংস্থা ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক রোজমেরি কেলানিক অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই চুক্তির মাধ্যমে যদি সৌদি আরবকে সরাসরি নিজেদের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুবিধা প্রদান করা হয়, তবে সেটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অত্যন্ত চমকপ্রদ ও বিপজ্জনক ঘটনা হবে।
মার্কিন সরকারের এই চুক্তির নেপথ্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলেছেন যে, বিশ্ববাসীকে সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকতে হবে যে এই চুক্তিগুলো পারমাণবিক নিরাপত্তা এবং অস্ত্র বিস্তার রোধের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সততা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখবে। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের সেরা পারমাণবিক প্রযুক্তি এবং মেধাবী বিজ্ঞানীদের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেই তৈরি করা হয়েছে, যা মূলত মার্কিন মাটিতেই উদ্ভাবিত হয়েছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগ আরও দাবি করেছে যে, এই কৌশলগত চুক্তিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা উভয়কেই সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে। একইসঙ্গে পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষার পাশাপাশি বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তির বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে আরও বেশি সুদৃঢ় করবে। তবে এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণ পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হবে, যেখানে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের বেশ কিছু আইনপ্রণেতা এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করতে পারেন বলে জোরালো রাজনৈতিক পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান মার্কিন কংগ্রেসে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি উচ্চ ও নিম্ন উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও, বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির অনেক সদস্য ইতিমধ্যে এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা শুরু করেছেন। এই চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে সৌদি আরবের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র চলে যাওয়ার যে চরম ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে সমালোচকদের তোলা সমস্ত কঠিন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সাম্প্রতিক ফিলিপাইন সফরকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কো রুবিও অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বিশ্বের এমন কোনো দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র কখনোই কোনো চুক্তি করবে না, যা আন্তর্জাতিক স্তরে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের সামান্যতম ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।