শহীদ দিবসের মঞ্চে চরম অপমান! মমতার সামনেই মাইক ছেড়ে ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে মঞ্চ ছাড়লেন টিএমসি সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) অত্যন্ত হেভিওয়েট এবং প্রবীণ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি দলের ঐতিহ্যবাহী ‘শহীদ দিবস’ পালনের মঞ্চে অত্যন্ত নাটকীয় পরিস্থিতির মুখে পড়ে চরম ক্ষোভে মঞ্চ ত্যাগ করেছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শহিদ দিবসের মহা-সমাবেশে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে সামান্য দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় ২৩ মিনিট একটানা ভাষণ দেওয়ার পরেই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি প্রকাশ্যেই মঞ্চ থেকে নেমে যান। মূলত নিজের বক্তব্যের সময়সীমা নিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত তীব্র ও প্রকাশ্য বাদানুবাদ বা তর্কবিতর্ক হয়েছিল। পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শ্রীরামপুরের এই দাপুটে সাংসদ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, সেদিন জনসভার মঞ্চে তাঁর সঙ্গে যা কিছু ঘটে গেছে, তাতে তিনি হৃদয়ে ভীষণভাবে আঘাত পেয়েছেন এবং তাঁর আত্মসম্মানে গভীর চোট লেগেছে।
এই ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন শহীদ দিবসের এই গুরুত্বপূর্ণ জনসভায় পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎ এসে উপস্থিত হন। সেই সময় মঞ্চে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় ভাষণ দিচ্ছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দলনেত্রীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে তিনি মাঝপথেই নিজের বক্তব্য কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দেন এবং নেত্রীকে স্বাগত জানান। এরপর তিনি পুনরায় নিজের নির্ধারিত বক্তৃতা চালিয়ে যান। যেহেতু সমগ্র অনুষ্ঠানটির নির্ধারিত সময়সূচি স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল, তাই মঞ্চের দায়িত্বে থাকা আয়োজকরা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর বক্তব্য দ্রুত সংক্ষেপ করে শেষ করার জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি প্রায় সাড়ে বাইশ মিনিট ধরে নিজের বক্তব্য চালিয়ে যান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বৃত্ত ও দলীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ এবং সময়ের স্বল্পতার কারণে সেদিনকার অনুষ্ঠানে উপস্থিত সমস্ত বক্তাদের আগেই স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে তাঁরা যেন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কথায় নিজেদের বক্তব্য শেষ করেন, কারণ কলকাতার বিখ্যাত বিড়লা তারামণ্ডল চত্বরে আয়োজিত ওই বিশাল জনসভায় সেদিন বক্তব্য রাখার জন্য সম্ভাব্য বক্তাদের দীর্ঘ একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। এই নির্দেশ অমান্য করেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তৃতায় রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি এবং বিধানসভার বিরোধী দলনেতার বিরুদ্ধে তোপ দাগার পাশাপাশি সদ্য দলবদল করে বেরিয়ে যাওয়া বিদ্রোহী তৃণমূল নেতাদের কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন।
বক্তৃতা শেষ করে যখন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বেশ চড়া গলায় তীব্র বাক্যবিনিময় ঘটে এবং এরপরই তিনি আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে রাগে গজগজ করতে করতে অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যান। দলীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, তাঁর এই দীর্ঘায়িত ভাষণের কারণে নাম তালিকায় থাকা সত্ত্বেও বহু প্রবীণ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা সেদিন জনসভাকে সম্বোধন করার সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হন। কলকাতা হাইকোর্টের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে শহীদ দিবসের এই জনসভাটি যেকোনো মূল্যে দুপুর ৩টার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে শেষ করতে হবে, অথচ সেই সময়েও দলের দুই শীর্ষ সেনাপতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল ভাষণ দেওয়াই বাকি ছিল। জনসভা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষোভের সুরে বলতে শোনা যায় যে, রাজ্যজুড়ে বিরোধীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় দলের বহু সাংসদ ও বিধায়ক ঘরে বসে সময় কাটাচ্ছেন, অথচ তিনি একা মাটি কামড়ে পড়ে আছেন। নিজের সাফাই দিতে গিয়ে তিনি পরে জানান যে, তাঁর বক্তব্যের পুরো সময়টা তিনি নিজে নষ্ট করেননি, বরং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পরবর্তীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চে প্রবেশ করায় তাঁকে বারবার নিজের বক্তব্য থামিয়ে বিরতি নিতে হয়েছিল। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে জানান যে, অতীতে যখন দলের কঠিন সময়ে বহু নেতা দল ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তখনও তিনি ঘাসফুল শিবিরের সঙ্গ ছাড়েননি। তাই আজ এই ধরনের অসম্মানজনক আচরণ তাঁর একেবারেই পাওনা ছিল না। তবে যখন সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় যে এই ঘটনার পর তিনি কি দলনেত্রীর শিবির ত্যাগ করার কথা ভাবছেন, তখন তিনি এই জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে পাল্টা বলেন যে এই ধরণের প্রশ্ন একেবারেই ভিত্তিহীন।