লোকসভার অন্দরে হাতাহাতি ও চরম উত্তেজনা! ‘চোর’ বলায় সাসপেন্ড টিএমসি সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

সংসদের বাদল অধিবেশন চলাকালীন লোকসভার অন্দরে এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন হাঙ্গামার ঘটনা ঘটেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) অত্যন্ত দাপুটে এবং পরিচিত মুখ তথা প্রবীণ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বুধবার লোকসভার চলতি বাদল অধিবেশনের বাকি পুরো সময়ের জন্য সংসদীয় কক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরখাস্ত বা সাসপেন্ড করা হয়েছে। অত্যন্ত কঠোর এই অনুशाসनात्मक পদক্ষেপটি ঠিক তখনই গ্রহণ করা হলো, যখন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দলেরই একদল দলবদলকারী বাগী সংসদ সদস্যকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে ‘চোর’ বলে কুরুচিকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিরোধীদের হাঙ্গামা ও হট্টগোলের জেরে যখন লোকসভার অধিবেশন সাময়িকভাবে মুলতবি করা হয়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই সংসদীয় চেম্বারের ভেতরে এই তীব্র বাকযুদ্ধ এবং চরম উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন স্বয়ং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর সঙ্গে এর আগেই এনসিপিআই (NCPI)-র কয়েকজন মহিলা সংসদ সদস্যের অত্যন্ত উত্তপ্ত ও আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা কাটাকাটি হয়েছিল। উল্লেখ্য, এই মহিলা সাংসদরা হলেন যথাক্রমে মিতালী বাগ, শতাব্দী রায় এবং কাকলি ঘোষ দস্তিদার। এঁরা প্রত্যেকেই অতীতে ঘাসফুল শিবির বা তৃণমূলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে দল বদল করে নবরূপে আত্মপ্রকাশ করা এনসিপিআই দলে যোগ দেন।

তৃণমূল সুপ্রিমো তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত অনুগত ও বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে পরিচিত কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে অধিবেশন মুলতবি হওয়ার ঠিক পরপরই ওই বিদ্রোহী সাংসদদের সঙ্গে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে তর্কে লিপ্ত হতে দেখা যায়। তবে এই আকস্মিক ও তীব্র উত্তেজনার অন্তর্নিহিত মূল কারণটি ঠিক কী ছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট জানা যায়নি। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে যাওয়া বিরোধী শিবিরের একাধিক সাংসদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং দুই পক্ষকে শান্ত করতে দ্রুত মাঝখানে এসে মধ্যস্থতা করেন। যখন উপস্থিত কিছু সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চান যে ঠিক কী কারণে এত বড় গন্ডগোল বাঁধল, তখন তিনি কোনো পরিষ্কার উত্তর না দিয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে লোকসভা চেম্বার থেকে দ্রুত বেরিয়ে যান। এই চাঞ্চল্যকর বাদানুবাদের রেশ কাটতে না কাটতেই মিতালী বাগ, কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং এনসিপিআই-এর অন্যান্য শীর্ষ সাংসদরা সোজা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত কক্ষে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন এবং সমগ্র ঘটনার বিবরণ দিয়ে তীব্র আপত্তি জানান।

সংসদীয় সূত্র মারফত প্রাপ্ত খবরে জানা গিয়েছে যে, লোকসভার স্পিকার এই গুরুতর অভিযোগ শোনার পর এনসিপিআই-এর ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা সাংসদদের এই বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লোকসভার অন্দরে ঘটে যাওয়া এই লজ্জাজনক ঘটনাটি আদতে তৃণমূল কংগ্রেস দলের ভেতরে সৃষ্টি হওয়া একটি বিরাট ফাটলেরই অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর থেকেই টিএমসি-র অন্দরে চরম অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। এই পটপরিবর্তনের জেরে তৃণমূলের প্রায় ২০ জন সাংসদ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মূল দল ছেড়ে ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI)-র সঙ্গে হাত মেকান। এই বাগী সাংসদরা লোকসভার ভেতরেও টিএমসি-র মূল আসনগুলো ছেড়ে আলাদাভাবে বসতে শুরু করেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা প্রকাশ্যে দেশের শাসকপক্ষ তথা এনডিএ (NDA) সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নীতির প্রতি নিজেদের পূর্ণ সমর্থনের কথা ঘোষণা করে রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছেন।