অতিরিক্ত আনন্দই কেড়ে নিতে পারে প্রাণ! জানেন কী এই মারাত্মক ‘হ্যাপি হার্ট সিনড্রোম’ সম্পর্কে?

খুশির মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে ভয়াবহ বিপদ। ছোটবেলা থেকেই আমরা প্রবীণদের মুখে শুনে এসেছি যে অতিরিক্ত দুঃখ মানুষকে ভেঙে দেয় বা দুঃখের চোটে হার্ট ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। অতিরিক্ত আনন্দ, চরম উত্তেজনা বা হঠাৎ পাওয়া কোনো বিরাট সারপ্রাইজও মানুষের হার্টের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। চিকিৎসকরা এই বিশেষ শারীরিক অবস্থাকে নাম দিয়েছেন ‘হ্যাপি হার্ট সিনড্রোম’। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে তাকোৎসুবো কার্ডিওমায়োপ্যাথি বলা হয়। অতীতে এই রোগটিকে বেশ বিরল বলে মনে করা হলেও বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এর আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আমাদের শরীরের ভেতরে এই বিশেষ পরিস্থিতিতে ঠিক কী ঘটে? যখন কোনো মানুষ প্রচণ্ড আনন্দ পান বা অতিরিক্ত ভয় পান, তখন তার শরীরে অ্যাড্রেনালিন এবং কর্টিসলের মতো বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা হঠাৎ করে হু হু করে বেড়ে যায়। হরমোনের এই মারাত্মক ঝড় হার্টের বাম নিলয়ের পেশিগুলোকে সাময়িকভাবে অকেজো বা দুর্বল করে দেয়। এর ফলে হার্ট তখন আর স্বাভাবিক নিয়মে রক্ত পাম্প করতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে রোগীর বুকের বাঁ দিকে তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং চরম শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, হার্টের আকৃতি জাপানিদের ব্যবহৃত অক্টোপাস ধরার বিশেষ পাত্র ‘তাকোৎসুবো’-র মতো ফুলে যাওয়ার কারণেই এই রোগের এমন নামকরণ করা হয়েছে।
চিকিৎসা গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, সাধারণত ৫৫ বছরের বেশি বয়সের মহিলারা এই রোগে সবথেকে বেশি আক্রান্ত হন। এর মূল কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা বলছেন, মেনোপজের পর শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে হার্ট স্ট্রেস বা চাপের বিরুদ্ধে ঠিকমতো লড়াই করতে পারে না। এছাড়া যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা অতিরিক্ত উদ্বেগের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কোনো চমৎকার বিয়ের প্রস্তাব পাওয়া, হঠাৎ লটারিতে কোটি টাকা জেতা, প্রিয় দলের নাটকীয়ভাবে ফাইনাল ম্যাচ জেতা কিংবা জীবনের কোনো বড় আনন্দের খবর পাওয়া—এই ধরনের তীব্র আবেগঘন মুহূর্তগুলোই মূলত এই সিনড্রোমের প্রধান ট্রিগার হিসেবে কাজ করে।
সাধারণ হার্ট অ্যাটাক এবং হ্যাপি হার্ট সিনড্রোমের লক্ষণগুলো দেখতে প্রায় একই রকম হয়। দুক্ষেত্রেই বুকে প্রচণ্ড চাপ অনুভব হওয়া, বাঁ হাত বা চোয়াল পর্যন্ত তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়া, হঠাৎ করে শরীর ঘেমে যাওয়া, বমি ভাব এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। তবে মূল পার্থক্য হলো, হ্যাপি হার্ট সিনড্রোমে আক্রান্ত রোগীর হার্টের রক্তনালীতে কোনো ধরনের ব্লকেজ বা বাধা থাকে না। চিকিৎসকরা ইসিজি, রক্ত পরীক্ষা এবং ইকোকার্ডিওগ্রামের মাধ্যমেই এই রোগ নিশ্চিত করেন। তবে আশার কথা হলো, প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক চিকিৎসায় ৪ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে হার্ট আবার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
এই রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো আলাদা ওষুধ না থাকলেও, চিকিৎসকরা সাধারণত বিটা ব্লকার, এসিই ইনহিবিটর এবং রক্ত পাতলা করার ওষুধ প্রেসক্রাইব করে থাকেন। রোগীকে কয়েকদিন হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখার পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে ভবিষ্যতে এই রোগের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে জীবনযাত্রার ধরনে বড় পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।