একই মাসে এক পরিবারের তিন ছবি! ছেলের জন্য নিজের ছবির শো ছাড়তে রাজি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়!

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক অভাবনীয় এবং বিরল অধ্যায়ের সাক্ষী থাকতে চলেছে দর্শককুল। একই মাসে একটি পরিবারের তিন সদস্যের তিনটি আলাদা ছবি মুক্তি পাচ্ছে, আর সেই তিনটি ছবির সঙ্গেই ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে গাঙ্গুলি পরিবারের নাম। জুলাই, ২০২৬ মাসটি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁদের পুত্র উজান গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্য একেবারেই ঐতিহাসিক এক মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।
গত ১০ জুলাই মুক্তি পেয়েছে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’। এর ঠিক দু’সপ্তাহ পর, ২৪ জুলাই বড় পর্দায় আসছে কৌশিক ও চূর্ণীর ছেলে উজান গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম পরিচালিত ছবি ‘কাতুকুতু বুড়ো’। আর মাসের ঠিক শেষ দিনে, অর্থাৎ ৩১ জুলাই বড় পর্দায় পুনরায় ফিরছে চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় অভিনীত বহুচর্চিত ও প্রশংসিত ছবি ‘নির্বাসিত’। এক মাসের ব্যবধানে একই পরিবারের তিন সদস্যের তিনটি ছবির এই সমসাময়িক মুক্তি নিঃসন্দেহে ভারতীয় তথা বাংলা চলচ্চিত্র জগতে অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা।
এই বিশেষ মুহূর্তকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি বসেছিলেন কৌশিক ও চূর্ণী। আশ্চর্যের বিষয় হল, সেই সাক্ষাৎকারের সঞ্চালক ছিলেন না অন্য কেউ, তাঁরা নিজেরাই একে অপরের সাক্ষাৎকার নেন। সেখানেই উঠে আসে এক অত্যন্ত আবেগঘন এবং নাড়া দেওয়ার মতো প্রশ্ন। চূর্ণী তাঁর স্বামী কৌশিককে প্রশ্ন করেন, যদি প্রেক্ষাগৃহ থেকে অনুরোধ আসে উজানের ছবির জন্য ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’-র কিছু শো ছেড়ে দেওয়ার, তবে তিনি সেই পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবেন? সবটাই কি পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে দেখবেন?
প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই কৌশিক অত্যন্ত স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, উজানের ক্ষেত্রে তিনি কখনই শুধুমাত্র একজন পেশাদার পরিচালক বা শিল্পী হয়ে থাকতে পারবেন না। একজন বাবা হিসেবে তাঁর অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি একটি বাস্তব ঘটনার উল্লেখ করে জানান, একটি সিনেমা হলে ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ মুক্তির দ্বিতীয় সপ্তাহেই তাঁদের ছবির বিশাল ড্রপডাউন খুলে সেখানে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘কাতুকুতুবুড়ো’-র প্রচার ব্যানার। যিনি সেই কাজ করেছিলেন, তিনি পরে ভালোবাসার সঙ্গে সেই ছবি কৌশিককে পাঠিয়েছিলেন।
অনেকে হয়তো এমন পরিস্থিতিতে বিরক্ত হতেন, কিন্তু কৌশিকের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ইতিবাচক। তাঁর স্পষ্ট কথা, একটুও খারাপ লাগেনি, বরং নিজের সন্তানের ছবির পোস্টার সেই জায়গায় দেখে তাঁর ভীষণ ভালো লেগেছে। তিনি মনে করেন, বাবা-মা হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি বা আনন্দ আর কিছুই হতে পারে না। তবে একই সঙ্গে কৌশিক অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি কথাও যোগ করেন। তাঁর মতে, কোনো শিল্পী, সাহিত্যিক বা খেলোয়াড় তাঁর সন্তানকে শুধু নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে পারেন না। প্রতিভা না থাকলে সাফল্য কোনোদিন আসে না। যদি তা-ই হতো, তবে সমস্ত সুপারস্টার এবং কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের সন্তানরাই শীর্ষে থাকত। বাস্তবে নিজের জায়গা তৈরি করার জন্য প্রতিভার কোনো বিকল্প নেই।
কৌশিক আরও বলেন, বাবা-মা হিসেবে তাঁরা সর্বোচ্চ যা করতে পারেন তা হলো সন্তানের জন্য কিছুটা জমি বা জায়গা ছেড়ে দেওয়া। প্রয়োজন হলে নিজের ছবির প্রচার ব্যানার বা শো ছেড়ে দিতে পারেন তিনি, এবং সেটা কোনো ধরনের আক্ষেপ বা দ্বিধা ছাড়াই একশো শতাংশ মন থেকে করবেন। তবে একটি নির্দিষ্ট শর্তের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কৌশিকের স্পষ্ট মন্তব্য, “উজান ছাড়া আর কারও জন্য আমি এই কাজ করব না।”
অন্যদিকে, দ্য ওয়ালের পক্ষ থেকে চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছেও এই বিরল ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন রাখা হয়। তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, ৩১ জুলাই ফের মুক্তি পাচ্ছে ‘নির্বাসিত’, সমসাময়িক চলছে কৌশিকের ছবি এবং মুক্তি পাচ্ছে উজানের প্রথম পরিচালিত ছবি। অর্থাৎ, একই পরিবারের তিনজনের তিনটি সিনেমা একই সময়ে প্রেক্ষাগৃহে দাপট দেখাবে। এই অনুভূতি ঠিক কেমন?
চূর্ণীর উত্তরও ছিল বিস্ময় এবং গভীর আবেগের এক অপূর্ব মিশ্রণ। তিনি বলেন, সত্যিই তিনি জানেন না এমন ঘটনা পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেছে কি না। তবে সবচেয়ে মজার ও চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই তিনটি ছবিতেই তিনি কোনো না কোনোভাবে অভিনয় করেছেন। ফলে তাঁর নিজের মধ্যেও এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চিত অনুভূতি কাজ করছে।
চূর্ণীর মতে, একসঙ্গে তিনটি ছবির মুক্তি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আনন্দের। তবে ‘নির্বাসিত’-এর এই পুনর্মুক্তি তাঁর কাছে নিছক আর একটি রিলিজ নয়। এই ছবির ফিরে আসা যেন এক ধরনের গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য, যা শুধু বাংলা চলচ্চিত্রের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর বাইরেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ‘কাতুকুতুবুড়ো’-তে তাঁর চরিত্রটি ছোট হলেও, সেই ছবিরও তিনি একজন গর্বিত অংশীদার। এই সম্পূর্ণ ঘটনাটিকে তিনি এক সুবচন সময়, এক অনন্য স্মৃতি এবং এক বিশেষ ট্রিবিউট হিসেবেই দেখতে ভালোবাসেন।
একটিমাত্র পরিবার, তিনটি ভিন্ন সিনেমা, তিনজন প্রথিতযশা শিল্পী, অথচ সকলের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু একটাই। চরম প্রতিযোগিতার এই বাজারেও যেখানে একজন বাবা নিজের ছবির শো স্বেচ্ছায় আনন্দের সঙ্গে ছেলের জন্য ছেড়ে দিতে প্রস্তুত, আর মা একই সঙ্গে তিনটি ছবির যাত্রার সাক্ষী হয়ে ইতিহাসের এক বিরল মুহূর্তকে বুকে ধারণ করছেন, সেখানে এই গল্প শুধুই বিনোদন বা সিনেমার নয়। এটি এমন এক পরিবারের গল্প, যেখানে সাফল্যের চাবিকাঠির থেকেও অনেক বেশি বড় হয়ে ওঠে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস, অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং নিঃস্বার্থ সমর্থন।