দীর্ঘদিনের প্রেমে কি ফুরিয়ে গেছে উত্তেজনার রসায়ন? ‘রিলেশনশিপ ফ্যাটিগ’-এর ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার চাবিকাঠি লুকিয়ে কোন জাদুকরী উপায়ে?

‘সব ঠিকই আছে, কিন্তু কেমন যেন লাগছে না।’ আজকালকার দিনে ৫ কিংবা ১০ বছরের দীর্ঘ সম্পর্কে প্রবেশ করলেই এই একটিমাত্র লাইন সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। সকালে ঘুম ভাঙার পর চিরাচরিত ‘গুড মর্নিং’ থেকে শুরু করে রাতে ‘ঘুমিও ভালো করে’, মাঝে কেবল অফিস, বাজার করা কিংবা ইলেকট্রিক বিল নিয়ে টুকটাক যান্ত্রিক কথা। সম্পর্কে কোনো ভয়াবহ ঝগড়া নেই, তিক্ত কোনো অশান্তি নেই, এমনকি প্রতারণার মতো কালিমাও নেই। তবুও মনের গভীরে কোথাও একটা জমাট বাঁধা ফাঁকা ভাব এবং অদ্ভুত নিস্তব্ধতা কাজ করে। সম্পর্কে কোনো বাড়তি উত্তেজনা থাকে না, থাকে না কোনো চমক কিংবা সেই প্রথম দিনের মতো চেনা নার্ভাস ফিলিংসটুকুও। বর্তমান যুগের রিলেশনশিপ কাউন্সেলররা এই অদ্ভুত মানসিক অবস্থাকে নাম দিয়েছেন ‘রিলেশনশিপ ফ্যাটিগ’ বা সম্পর্কের চরম একঘেয়েমি। আর ঠিক এই জটিল সমস্যার এক সহজ ও আধুনিক সমাধান হিসেবে এখন গোটা ইন্টারনেট দুনিয়ায় তুমুল চর্চায় আসছে একটি নতুন শব্দ—‘রিলেশনশিপ ডিটক্স’।
সহজ কথায় বলতে গেলে, রিলেশনশিপ ডিটক্স হলো সম্পর্কের শরীর থেকে সমস্ত জমে থাকা মানসিক ‘টক্সিন’ বা বিষ বের করে দেওয়ার একটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া। এখানে টক্সিন বলতে কোনো শারীরিক বিষ বোঝানো হচ্ছে না, বরং সেই সমস্ত ক্ষতিকর মানসিক অভ্যাস ও আচরণকে নির্দেশ করা হচ্ছে যা ধীরে ধীরে পারস্পরিক ভালোবাসাকে তিলে তিলে মেরে ফেলে। যেমন—সারাদিন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ গুঁজে থাকা, একই একঘেয়ে ছকে বাঁধা যান্ত্রিক রুটিন মেনে চলা, একে অপরকে পর্যাপ্ত কোয়ালিটি টাইম না দেওয়া, কিংবা তিন মাস আগের পুরনো ঝগড়ার কথা তুলে আজও খোঁটা দেওয়ার স্বভাব। তবে ডিটক্স মানে এই নয় যে আপনাকে সঙ্গে সঙ্গে ব্রেকআপ করতে হবে কিংবা কয়েকদিনের জন্য সঙ্গীর সঙ্গে সমস্ত কথা চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে। বরং এটি হলো ৭ থেকে ২১ দিনের একটি বিশেষ সময়, যখন ইচ্ছে করে সম্পর্কটার ‘রিসেট’ বোতাম টেপা হয় যাতে দুই জন মানুষ আবার নতুন চোখে একে অপরকে আবিষ্কার করতে পারেন। শরীরের মেদ বা বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করলে যেমন শরীর চনমনে হয়ে ওঠে, তেমনি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই ডিটক্স এক অদ্ভুত সতেজতা ফিরিয়ে আনে।
আপনার এই একঘেয়ে সম্পর্কে কীভাবে সফলভাবে প্রয়োগ করবেন ‘রিলেশনশিপ ডিটক্স’? বিশেষজ্ঞদের মতে এর মোট পাঁচটি নির্দিষ্ট ধাপ রয়েছে। প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো ডিজিটাল ডিটক্স এবং একে অপরকে সময় দেওয়া। আজকাল আমরা প্রিয় মানুষের ঠিক পাশেই বসে থাকি, অথচ দুজনেরই দৃষ্টি থাকে মুঠোফোনের স্ক্রিনে। রিলস দেখা, সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা কিংবা অফুরন্ত নোটিফিকেশনের ভিড়ে হারিয়ে যায় আসল মানুষগুলো। ডিটক্স পিরিয়ডে প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা দুজনেই ফোন সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রাখুন। বারান্দায় এক কাপ চা হাতে মুখোমুখি বসুন এবং একে অপরের চোখে চোখ রেখে কথা বলুন। ‘আজ তোমার দিনটা কেমন কাটল’—এই অত্যন্ত সাধারণ প্রশ্নটাই কিন্তু মনের অজান্তে অনেক অদৃশ্য দূরত্ব নিমিষে কমিয়ে দিতে পারে। দ্বিতীয় স্টেপ হলো দীর্ঘদিনের একঘেয়ে রুটিন ভেঙে চুরমার করা। প্রতি শনিবার যদি একই রেস্তোরাঁয় যাওয়া আর প্রতি রবিবার যদি একই ওয়েব সিরিজ দেখার অভ্যাস থাকে, তবে সম্পর্কে একঘেয়েমি আসবেই। তাই হঠাৎ কোনো পরিকল্পনা করে ফেলুন; সকাল সকাল প্রিয়জনকে নিয়ে লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়ুন, ছাদের ওপর চাদর পেতে খোলা আকাশের নিচে একসাথে ডিনার করুন, কিংবা একসঙ্গে নতুন কোনো রান্না শিখুন। জীবনের নতুন অভিজ্ঞতা মানেই আমাদের মস্তিষ্কে তৈরি হয় নতুন কেমিস্ট্রি।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে জরুরি নিয়ম হলো সমস্ত ধরনের অভিযোগের বাক্স সাময়িক বন্ধ রাখা। ডিটক্সের এই নির্দিষ্ট দিনগুলোতে পুরনো কোনো প্রসঙ্গ তুলে আনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। চতুর্থ স্টেপ হলো সঙ্গীকে কিছুটা ব্যক্তিগত স্পেস বা জায়গা দেওয়া। সারাদিন আঠার মতো একে অপরের সঙ্গে লেপ্টে থাকলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই হাঁপিয়ে ওঠে। তাই দুই থেকে তিন দিন নিজের ব্যক্তিগত শখ, জিম বা বন্ধুদের আড্ডায় সময় কাটান। একটু দূরত্ব তৈরি হলেই প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে আসার প্রবল ইচ্ছেটা আবার জেগে ওঠে। আর পঞ্চম ও অন্তিম ধাপ হলো কৃতজ্ঞতা প্রাকটিস করা। আমরা অনর্গল অভিযোগ করতে অভ্যস্ত হলেও ধন্যবাদ জানাতে ভুলে যাই। তাই রোজ রাতে ঘুমানোর আগে একে অপরকে ছোট কোনো কাজের জন্য ধন্যবাদ দিন। যখন মনে হবে আপনাদের সম্পর্কটা প্রেমিকের মতো না থেকে নিছক দুজন রুমমেটের মতো হয়ে গেছে, তখন বুঝবেন এই ডিটক্সেরই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।