‘গান্ধারীর মতো অন্ধ হয়ে গিয়েছেন!’ দলীয় সুপ্রিমোকে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্রের বিস্ফোরক মন্তব্য!

কলকাতার মেয়ো রোডের বিকল্প একুশে জুলাইয়ের শহিদ স্মরণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে শাসক দলের অন্দরের ক্ষোভ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে নিয়ে এলেন কামারহাটির হেভিওয়েট তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্র। এদিন ঋতব্রত পন্থী তৃণমূলের এই মেগা সমাবেশ থেকে সরাসরি দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় নিশানা করেন তিনি। তাঁর এই চরম ও বিস্ফোরক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই গোটা রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য এবং ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছে। সভামঞ্চে উপস্থিত হাজার হাজার কর্মী-সমর্থকদের সামনে তিনি দাবি করেন যে, দলের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন এবং শীর্ষ নেতৃত্বের ভুল নীতির জন্যই আজ দল ভাঙনের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে মদন মিত্র অত্যন্ত কড়া সুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনাকে কেউ জন্ম থেকেই সেলিব্রিটি বা মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে দেয়নি। বাংলার মসনদে আপনাকে বসিয়েছিল যুব তৃণমূলের লক্ষ লক্ষ ঘাম ঝরানো সাধারণ কর্মীরা। আজ সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। আপনি একবার হেঁটে আমাদের মাঝে আসুন, আসুক সাধারণ মানুষ, গায়ে একটা ডিমও পড়বে না। আমাদের গলার এই উত্তরীয় আপনার পায়ের তলায় পেতে দেব। শুধু একবার এসে ক্যামেরার সামনে বলবেন যে আমার ভুল হয়েছিল, আমি এতদিন কৌরব সভার গান্ধারীর মতো চোখ বন্ধ করে অন্ধের মতো দল পরিচালনা করছিলাম!” এর পরই আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ও হুমকি সুরে যোগ করেন, “আমি অন্য কাউকে বলছি না, সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বলছি—অভিষেকের তরফ থেকে হয়তো আপনাদের এক ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আজ আমরা আপনাদের হাতে এক মাসের খোলা সময় দিচ্ছি। অবিলম্বে অভিষেকের ছায়া ও হাত ছেড়ে পুনরায় আসল তৃণমূলের হাত ধরুন। এই পার্টিটা কোনো একক ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, এই দলটা তৃণমূলের সাধারণ কর্মীদের ঘামে তৈরি!”
শুধু দলীয় সুপ্রিমোকেই নয়, এদিন নিজের বক্তৃতায় দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও চরম কটাক্ষ ও তীব্র আক্রমণে বিদ্ধ করেন মদন মিত্র। তাঁর আর্থিক দুর্নীতি এবং বিলাসবহুল জীবনযাত্রা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে কামারহাটির এই বিতর্কিত বিধায়ক বলেন, “আমি এতদিন ভাবতাম একটা ছোট ছেলে কত না কষ্ট করে বুঝি প্রচুর টাকা আয় করে—সেই ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ কোম্পানির নামে। চার্টার্ড ফ্লাইটে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু যখন দেখলাম অরূপ গিয়ে সেই অফিসে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তালাচাবি মেরে দিল, তখন আসল সত্যটা জানতে পারলাম! তখন বুঝতে পারলাম ওই কোটি কোটি টাকা অভিষেকের পিতৃদেবের নয়, ওটা আমাদের মতো তৃণমূল কংগ্রেসের লাখ লাখ গরিব কর্মীদের ঘাম ঝরানো কষ্টের টাকা। হে অভিষেক, আপনার এই কীর্তি দেখে আপনাকে আজ সলাম জানাতে হয়!”
রাজনৈতিক মহলের মতে, একুশের মূল মঞ্চের বাইরে এই বিকল্প সমাবেশ থেকে মদন মিত্রের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহ এবং বিস্ফোরক আক্রমণ শাসক দলের অন্দরের দীর্ঘদিনের সুপ্ত কোন্দল ও ক্ষমতার লড়াইকে একেবারে স্পটলাইটে নিয়ে চলে এসেছে। একদিকে যখন মূল মঞ্চ থেকে দলত্যাগীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছিল, ঠিক তখনই মেয়ো রোডের এই বিকল্প মঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা ও অভিষেকের বিরুদ্ধে খোদ দলেরই হেভিওয়েট নেতার এমন আক্রমণাত্মক অবস্থান আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে এক চরম রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল বিশেষজ্ঞরা।