বিষাক্ত র‍্যাটলস্নেকের জোড়া ছোবল! ৫৪ ডোজ অ্যান্টি-ভেনম নিয়ে প্রাণে বেঁচে ফেরা যুবকের সামনে এখন কোন চরম বিপদ?

বিষাক্ত ও প্রাণঘাতী সাপের কামড় খেলে মানুষের প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে নিজের অমূল্য প্রাণ বাঁচানো। সেই সংকটজনক মুহূর্তে চিকিৎসায় কত টাকা খরচ হবে, তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামান না, কারণ জীবনের চেয়ে মূল্যবান পৃথিবীতে আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু দিনের পর দিন মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর যদি কোনো হাসপাতাল আপনার হাতে সোয়া এগারো কোটি টাকার বেশি চিকিৎসার বিল ধরিয়ে দেয়, তবে আপনার মানসিক অবস্থা কেমন হবে? কল্পনা করতেই রক্ত হিম হয়ে আসে। ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যা গোটা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

আমেরিকার আইডাহো শহরের বাসিন্দা ক্রিস হাওয়ার্থ নিজের পরিবার ও তিন সন্তানকে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার ওরোভিল এলাকায় আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। আনন্দময় চার দিনের ছুটি কাটিয়ে সবাই যখন বাড়ি ফেরার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ঘটে যায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ক্রিস তাঁর বাবা-মায়ের বাগানে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটছিলেন, আর তখনই অসাবধানতাবশত ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটি অত্যন্ত বিষাক্ত র‍্যাটলস্নেকের ওপর তাঁর পা পড়ে যায়। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো কোনো সাধারণ গাছপালা বা ঘাসের ছোঁয়া লেগেছে, কিন্তু আসলে সেটি ছিল একটি মৃত্যুদূত স্বরূপ সাপ, যা মুহূর্তের মধ্যে তাঁর পায়ে পর পর দু’বার শক্তিশালী ছোবল মারে।

সাপের বিষাক্ত কামড়ের সঙ্গে সঙ্গেই মারাত্মক ও প্রাণঘাতী বিষ তাঁর সারা শরীরে ধমনীর মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে, জিব অসাড় হয়ে যায়, লিম্ফ নোডে তীব্র ফোলাভাব দেখা দেয় এবং ফুসফুসও ঠিকমতো কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তাঁকে দ্রুত নিকটবর্তী স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে চিকিৎসকেরা তাঁর জীবন বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালান। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তির কয়েক দিন পর তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং তিনি ‘ডিসেমিনেটেড ইন্ট্রাভাসকুলার কোয়াগুলেশন’ বা ডিআইসি নামক এক বিরল ও বিপজ্জনক জটিলতায় আক্রান্ত হন। এই অবস্থার জেরে সাপের বিষের প্রতিক্রিয়ায় তাঁর পুরো শরীরজুড়ে রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করে।

রোগীর প্রাণ বাঁচাতে চিকিৎসকেরা একের পর এক মোট ৫৪ ডোজ অ্যান্টি-ভেনম বা সাপের বিষের প্রতিষেধক প্রয়োগ করতে বাধ্য হন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, সেই হাসপাতালের সমস্ত প্রতিষেধকের মজুতই ফুরিয়ে যায়। এরপর ক্রিসকে দ্রুত এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বা হেলিকপ্টারে করে স্ট্যানফোর্ড মেডিক্যাল সেন্টারে স্থানান্তরিত করা হয়, যেখানে চিকিৎসকেরা ভিন্ন ও উন্নত প্রতিষেধক প্রয়োগ করে তাঁর অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল করেন। আইসিইউ-তে টানা ১২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে তিনি নতুন জীবন ফিরে পান এবং স্ত্রী জেনি ও তিন সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

বর্তমানে ক্রিস ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং প্রায় ৮০ শতাংশ পুনরুদ্ধার করেছেন। তবে তাঁর স্ত্রী জেনি সম্প্রতি যখন হাসপাতালের চূড়ান্ত চিকিৎসার বিল প্রকাশ্যে আনেন, তখন তা দেখে গোটা পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীরা রীতিমতো হতবাক হয়ে যান। জানা গেছে, সমস্ত বিমার কাভারেজের পরও দুটি হাসপাতালের মোট চিকিৎসা খরচ প্রায় ১১ কোটি টাকারও বেশি হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অ্যান্টি-ভেনমের প্রতিটি শিশির দাম ছিল প্রায় ১১ লক্ষ টাকা, এবং ক্রিসকে মোট ৫৪টি শিশি দিতে হয়েছিল। শুধু তাই নয়, স্ট্যানফোর্ড মেডিক্যাল সেন্টারের আইসিইউ-তে মাত্র এক রাত কাটানোর জন্য কক্ষভাড়া বাবদ বিল এসেছিল প্রায় ৫১ লক্ষ টাকা!

চিকিৎসকেরা যখনই পরবর্তী ডোজের কথা বলতেন, বিলের ভয়ে ক্রিস আতঙ্কিত হয়ে উঠতেন, যদিও প্রাণ বাঁচাতে তাঁর সামনে আর কোনো পথও খোলা ছিল না। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা পরিবারটিকে চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, কারণ গত মে মাস থেকে ক্রিস কর্মক্ষেত্রে ফিরতে পারেননি এবং তাঁর সমস্ত ছুটির মেয়াদও আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। এই চরম দুঃসময়ে পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে তাঁদের বন্ধুরা অনলাইনে একটি ‘গো ফান্ড মি’ (GoFundMe) পেজ খুলে অনুদান সংগ্রহ শুরু করেছেন। এত বিশাল ঋণের বোঝা সত্ত্বেও ক্রিসের পরিবার সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ যে তাঁদের স্বামী ও বাবা সুস্থ অবস্থায় আজও তাঁদের মাঝে বেঁচে আছেন।