অটোচালকের মেয়ে আজ জাতীয় পুরস্কারের আলোয়! চেন্নাইয়ের ফুটপাথ থেকে উঠে এসে যেভাবে বদলে গেল ‘মহারাজা’ অভিনেত্রীর জীবন!

ভারতের বিনোদন দুনিয়ায় প্রতিভাবান শিল্পীদের সংগ্রামের ইতিহাস নতুন কিছু নয়, তবে কিছু কিছু গল্প সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি ঘোষণা করা হয়েছে দেশের ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের চূড়ান্ত ফলাফল। আর এই মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে কড়া টক্কর দিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে দক্ষিণী সুপারস্টার বিজয় সেতুপতি অভিনীত সুপারহিট ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘মহারাজা’। এই ছবিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নজরকাড়া চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন তরুণী অভিনেত্রী সচনা নামিদাস। তিনি এই ছবির সুবাদে মর্যাদাপূর্ণ শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার এই চরম আনন্দের খবরের পরই সচনার জীবন সংগ্রামের এক না বলা ও হৃদয়বিদারক কাহিনী প্রকাশ্যে এসেছে, যা শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন চলচ্চিত্রপ্রেমীরা।

২০০৩ সালের ১লা মে তামিলনাড়ুর চেন্নাইতে জন্ম নেওয়া সচনা অত্যন্ত সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। তাঁর বাবা পেশায় একজন সাধারণ অটোচালক এবং মা জীবিকা নির্বাহের জন্য দর্জির কাজ করেন। সচনার একজন যমজ বোনও রয়েছে, যার নাম সাধনা নামিদাস। অত্যন্ত সীমাবদ্ধ অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্য দিয়ে বড় হলেও পড়াশোনায় বরাবরই মনোযোগী ছিলেন সচনা। তিনি চেন্নাইয়ের স্বনামধন্য এসএসএস জৈন উইমেন্স কলেজ থেকে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তবে এই সুদীর্ঘ শিক্ষা জীবন এবং কেরিয়ারের পথ মোটেও ফুলের বিছানা ছিল না।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের পর সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সচনা। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাঁকে ভীষণভাবে আবেগপ্রবণ দেখাচ্ছিল। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি তাঁর অতীতের কঠিন দিনগুলির কথা স্মরণ করে বলেন, “আমার বাবা একজন সাধারণ অটোচালক এবং মা দর্জির কাজ করতেন। আমি সম্পূর্ণ সরকারি কলেজে পড়াশোনা করেছি এবং অত্যন্ত সাধারণ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আমি।” নিজের অতীতকে কোনোদিনই লুকিয়ে রাখতে চান না এই উদীয়মান তারকা।

অতীতের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে সচনা আরও জানান, “আমাদের জীবনে এমন একটা সময় গেছে যখন স্কুলের সামান্য মাসিক বেতনটুকু জমা দেওয়ার মতো যথেষ্ট টাকাও আমাদের পরিবারের কাছে থাকত না। কোনোমতে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমি এবং আমার বোন সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক বৃত্তি পেতাম। সেই দুঃসময়ে মাত্র ৫০০ টাকা জোগাড় করাও আমাদের কাছে পাহাড়প্রমাণ কঠিন একটা লড়াই ছিল। কিন্তু সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমাদের বাবা-মা সবসময় আমাদের ওপর অগাধ বিশ্বাস রাখতেন এবং চরম অভাবের মধ্যেও আমাদের সব মৌলিক চাহিদা সাধ্যমতো মেটানোর চেষ্টা করতেন।”

অভিনয় জগতে নিজের স্থান করে নেওয়ার লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে সচনা প্রকাশ করেন যে, তাঁর পরিবার সবসময় তাঁর পাশে ছায়ার মতো ছিল। বাবা-মা নিজেদের সমস্ত কাজ ফেলে তাঁকে চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় সুযোগ পাওয়ার আশায় বিভিন্ন প্রোডাকশন হাউসে এবং স্টুডিওতে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। সামান্য একটা ছোট চরিত্র পাওয়ার জন্যও তাঁদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই বিষয়ে সচনা বলেন, “চলচ্চিত্রের অডিশনে গিয়ে সম্মুখীন হওয়া প্রতিটি প্রত্যাখ্যান বা রিজেকশন থেকে আমি নতুন কিছু না কিছু শিখেছি। তবে আজ পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। সব কষ্ট দূর হয়েছে। আজ আমার এই সাফল্যে আমার বাবা-মা এবং পরিবার আমার চেয়েও অনেক বেশি খুশি।”

উল্লেখ্য, বিজয় সেতুপতি অভিনীত ‘মহারাজা’ সিনেমাটি মুক্তির পর বক্স অফিসে এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। মাত্র ২০ কোটি টাকার সীমিত বাজেটে নির্মিত এই ছবিটি বক্স অফিসে ঝড় তুলে বিশ্বব্যাপী ২০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যবসা করে একটি সর্বকালীন ব্লকবাস্টার হিট তকমা অর্জন করে। এই বহুচর্চিত সিনেমায় প্রধান চরিত্রের পাশাপাশি অনুরাগ কাশ্যপ সহ একাধিক দক্ষ অভিনেতা অত্যন্ত প্রশংসনীয় অভিনয় করেছিলেন। তবে সব আলো নিজের দিকে কেড়ে নিয়েছেন এই তরুণী অভিনেত্রী, যিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে সঠিক একাগ্রতা এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে অভাবের তাড়নাও সাফল্যের পথ আটকাতে পারে না।