শাকিরার গান থেকে শুরু করে কোল্ডপ্লে ও বিটিএস-এর ম্যাজিক! ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম হাফটাইম শো কি দর্শকদের মন জয় করতে পারল?

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ শুধু স্পেনের ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর জয়ই নয়, বরং অন্য কারণেও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আমেরিকার জনপ্রিয় ক্রীড়া সংস্কৃতির মূল আকর্ষণ ‘সুপার বোল’-এর হাফটাইম শোর আদলে এবার ফুটবলের মহাঞ্চেও প্রথমবারের মতো বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফিফা। নিউ ইয়র্কের জমকালো মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত এই প্রিমিয়াম শোয়ের পরিকল্পনার দায়িত্বে ছিলেন ব্রিটিশ ব্যান্ড কোল্ডপ্লের জনপ্রিয় প্রধান গায়ক ক্রিস মার্টিন। তবে এই রঙিন ও তারকাময় আয়োজন যেমন একদল দর্শকের মন জয় করতে পেরেছে, তেমনই ফুটবল বিশেষজ্ঞদের একাংশের তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়েছে।

এদিনের গ্র্যান্ড শোয়ের শুরুতেই ব্রাজিলের ফুটবলের দুই কিংবদন্তি রোনাল্ডো ও রোনালদিনহো একটি চোখধাঁধানো ভিন্টেজ গাড়িতে চেপে মাঠে প্রবেশ করেন, যা দর্শকদের মধ্যে উন্মাদনা বাড়িয়ে দেয়। এরপর মঞ্চে আসেন বিশ্বখ্যাত পপ তারকা ম্যাডোনা, যাঁর জমকালো পারফরম্যান্স স্টেডিয়ামের উত্তাপ বাড়িয়ে দেয়। একে একে মঞ্চ মাতিয়ে তোলেন দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় মিউজিক ব্যান্ড বিটিএস। তাঁদের বিশ্বখ্যাত চার্টবাস্টার গান ‘Dynamite’-এর ছন্দে গোটা স্টেডিয়াম যেন আনন্দে মেতে ওঠে। এরপর জনপ্রিয় অভিনেতা জেসন সুডেইকিস তাঁর বিখ্যাত ‘টেড ল্যাসো’ চরিত্রে মাঠে প্রবেশ করে পরিচয় করিয়ে দেন পপ সেনসেশন জাস্টিন বিবারকে। তিনি তাঁর জাদুকরী কণ্ঠে পরিবেশন করেন আবেগঘন গান ‘Everything Hallelujah’। সবশেষে বিশ্বকাপের দাপ্তরিক ও অফিশিয়াল গান ‘Dai Dai’ গেয়ে পুরো মঞ্চ কাঁপিয়ে তোলেন গ্লোবাল পপ আইকন শাকিরা।

তবে এই তারকাখচিত জমকালো অনুষ্ঠান শেষ হতে সময় নেয় প্রায় ২৭ মিনিট, যা ফুটবল ম্যাচের প্রচলিত ১৫ থেকে ২০ মিনিটের প্রথমার্ধের বিরতির তুলনায় অনেকটাই বেশি। আর এই দীর্ঘ বিরতির পরেই শুরু হয় মূল বিতর্ক। ম্যাচ শেষে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির লাইভ আলোচনায় অংশ নিয়ে ইংল্যান্ডের প্রাক্তন তারকা ফুটবলার ওয়েন রুনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে তিনি এই আয়োজন একেবারেই উপভোগ করতে পারেননি। তাঁর সোজা কথা, তিনি ব্যক্তিগতভাবে শাকিরা বা জাস্টিন বিবারকে পছন্দ করলেও ফুটবলের মাঠে এই ধরনের বিনোদন তাঁকে মোটেও আকৃষ্ট করেনি। তিনি বরং অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন কখন আবার মূল খেলা মাঠে গড়াবে। এমনকি তিনি মজার ছলে এও মন্তব্য করেন যে, এই পুরো অনুষ্ঠানের সেরা মুহূর্ত ছিল কেবল এর শেষ হওয়াটা।

প্রাক্তন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অধিনায়ক রয় কিনও প্রায় একই সুরে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, টেলিভিশনের পর্দায় ম্যাচ উপভোগ করা দর্শকদের কাছে এই হাফটাইম শো খুব একটা জমাটি ঠেকেনি, যদিও স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকেরা হয়তো পরিবেশনাটি কিছুটা উপভোগ করেছেন। তবে শাকিরার পারফরম্যান্স তাঁর কিছুটা হলেও ভালো লেগেছে বলে তিনি স্বীকার করেন। অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল জগতেও এই আয়োজন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার ঝড় ওঠে। ক্ষুব্ধ ফুটবলপ্রেমীদের কেউ কেউ লিখেছেন যে তাঁরা ফাইনাল ম্যাচ দেখতে বসেছেন, কোনো পূর্ণাঙ্গ পপ কনসার্ট উপভোগ করতে নয়। আবার অনেকের মতে, আমেরিকা সব বড় ক্রীড়া ইভেন্টকেই অহেতুক বাণিজ্যিক বিনোদনের মঞ্চে পরিণত করতে চায়।

যদিও মাঠের ক্রিকেটের মতো ফুটবলের এই মহারণে শেষ হাসি হাসে স্পেনই। লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন কঠিন প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে দীর্ঘ ১৬ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি নিজেদের করে নেয় স্প্যানিশ দল। অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে দলের তারকা ফুটবলার ফেরান তোরেসের দুর্দান্ত হেডের গোলই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপের ফাইনালে আয়োজিত এই প্রথম হাফটাইম শো যেমন এক নতুন ক্রীড়া ইতিহাসের সূচনা করল, তেমনই ফুটবলপ্রেমীদের মনে এক গভীর প্রশ্নও রেখে গেল— ফুটবলের পবিত্রতম ও সবচেয়ে বড় মঞ্চে কি সত্যিই এমন দীর্ঘ বিনোদনের কোনো প্রয়োজন ছিল?