রাজকুমার হিরানির প্রথম ওটিটি সিরিজে বড় ধামাকা! সাইবার ক্রাইম থ্রিলার নাকি শুধুই বন্ধুত্বের গল্প?

বলিউডের বিখ্যাত ও বিশ্বস্ত নির্মাতা রাজকুমার হিরানি মানেই সেলুলয়েডে হাসি, কান্না, আবেগ এবং জীবনের এক নতুন দর্শন। তাই তাঁর নাম যখন প্রথম কোনো ওটিটি (OTT) সিরিজের সঙ্গে যুক্ত হলো, তখন থেকেই সিনেপ্রেমীদের মধ্যে কৌতূহল ও উত্তেজনার পারদ চড়েছিল তুঙ্গে। সাইবার ক্রাইম, রোমহর্ষক অপহরণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিখাদ বন্ধুত্বের বুননে তৈরি ছয় পর্বের নতুন সিরিজ ‘প্রীতম অ্যান্ড পেড্রো’ কি শেষ পর্যন্ত দর্শকদের সেই আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা সফলভাবে পূরণ করতে পেরেছে? নাকি সুচারু গল্পের মাঝেও কোথাও না কোথাও থেকে গেছে অপূর্ণতার সামান্য স্বাদ? এই সমস্ত প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে চলছে তীব্র আলোচনা।

এই নতুন সিরিজের মূল আবর্তে রয়েছেন গোয়ার একনিষ্ঠ পুলিশ অফিসার পেড্রো, যাঁর মূল কাজ মাঠে নেমে সরাসরি অপরাধীদের পাকড়াও করা। কিন্তু আধুনিক কম্পিউটার বা প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটি বিষয়ে তাঁর জ্ঞান প্রায় শূন্যের কোঠায়। হঠাৎই তাঁকে বদলি করা হয় সাইবার ক্রাইম বিভাগে, যেখানে তাঁর কাজের সঙ্গী হয়ে ওঠে এক তরুণ প্রতিভাবান হ্যাকার প্রীতম। একজন সম্পূর্ণ পুরনো পন্থায় বিশ্বাসী মানুষ, আর অন্যজন পুরোপুরি আধুনিক জেন জি (Gen Z)। প্রাথমিকভাবে দুজনের মানসিক দূরত্ব ও মতপার্থক্য তৈরি হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসই একসময় রূপ নেয় অটুট বন্ধুত্বে। সমালোচকদের মতে, গোটা সিরিজের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুন্দর দিকটি হলো এই সম্পর্কের বুনোট।

তবে গল্পের মোড় হঠাৎই ঘুরতে শুরু করে যখন এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ছেলেকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যকর অপহরণের ঘটনা ঘটে। তদন্তের গভীরে প্রবেশ করতে গিয়ে সামনে আসে এমন এক কুখ্যাত অপরাধী, যে পিস্তল বা বন্দুকের বদলে ইন্টারনেট, গোপন ডেটা এবং ক্ষতিকর ভুয়ো তথ্যকে হাতিয়ার করে অপরাধ সংগঠিত করে। বাস্তব জীবনের বিশিষ্ট সাইবার বিশেষজ্ঞ অমিত দুবের লেখা শিক্ষামূলক বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই কাহিনি বর্তমান যুগের ডিজিটাল অপরাধের অন্ধকার দিকটিকে তুলে ধরতে চেয়েছে। তা সত্ত্বেও বহু সমালোচক এই সাইবার অপরাধের উপস্থাপনা নিয়ে ঘোর আপত্তি তুলেছেন। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI), ডিপফেক এবং অত্যাধুনিক অনলাইন প্রতারণার যুগে এই সিরিজের সাইবার অপরাধের প্রেক্ষাপট অনেকটাই পুরনো এবং বিষয়টিকে বড় বেশি সহজ করে দেখানো হয়েছে, যার ফলে থ্রিলারের তীব্র উত্তেজনা বা রোমাঞ্চ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, আবেগের নিরিখে বিচার করলে সিরিজটি যথেষ্ট সফল। প্রযুক্তির শীতল লড়াইয়ের মাঝেও বারবার মানুষের গল্প ও অনুভূতির গভীরতা সামনে চলে আসে। প্রীতম ও পেড্রোর না বলা অতীত, তাঁদের অভ্যন্তরীণ মানসিক লড়াই, অতীতের ভুল শুধরে নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা এবং ধীরে ধীরে একটি পরিবারের মতো হয়ে ওঠার মুহূর্তগুলো দর্শকের মনে গভীর রেখাতাপ তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত অপরাধের জটিল রহস্য সমাধানের চেয়েও তাঁদের দুই জেনারেশনের বন্ধুত্বের রসায়ন দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে।

অভিনয়ের দিক বিচার করলে সুপরিচিত অভিনেতা আরশাদ ওয়ার্সি এই সিরিজের অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী সম্পদ। প্রযুক্তির কাছে অসহায় এক সৎ পুলিশ অফিসারের চরিত্রে তাঁর অভিনয় একেবারে স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য। কমিক দৃশ্য হোক বা আবেগঘন মুহূর্ত—সবক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ করেছেন। অন্যদিকে, প্রীতমের ভূমিকায় রাজকুমার হিরানির পুত্র বীর হিরানি নতুন মুখ হিসেবে ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছেন। তবে তাঁর অভিনয় নিয়ে দর্শকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেকেরই ধারণা, তাঁর সংলাপ প্রক্ষেপণ এবং অভিব্যক্তিতে ভবিষ্যতে আরও পরিণত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

এছাড়াও এই সিরিজে ভিক্রান্ত ম্যাসি, মোনা সিং, বোমান ইরানির মতো প্রথম সারির তারকারা থাকলেও তাঁদের ক্ষমতা অনুযায়ী অত্যন্ত সীমিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে মোনা সিংয়ের মতো প্রতিভাবান অভিনেত্রীর চরিত্রটি আরও বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত। পরিচালক অবিনাশ অরুণের পরিচালনা থেকে অনেকেই আরও গভীর নির্মাণ আশা করেছিলেন, কিন্তু গোয়ার আবহাওয়া বা থ্রিলারের আবহ অনেক সময়েই সেই কাঙ্ক্ষিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। গল্পের গতি মাঝে মাঝে ধীর হয়ে যাওয়ায় নাটকীয়তার টানটান ভাব কিছুটা হলেও হারিয়ে যায়।

সব মিলিয়ে ‘প্রীতম অ্যান্ড পেড্রো’ কোনো নিখুঁত বা পিনড্রপ সাইলেন্সের থ্রিলার নয়, আবার একে পুরোপুরি হতাশাজনকও বলা চলে না। এটি এমন এক ভিন্ন স্বাদের সিরিজ, যেখানে সাইবার অপরাধ কেবল গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি বাহানা মাত্র, আর আসল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মন জয় করা। রাজকুমার হিরানির নামের পাশে যে বিশাল প্রত্যাশার পাহাড় জমে থাকে, তার মাপকাঠিতে বিচার করলে কিছু প্রশ্ন অবধারিতভাবেই থেকে যায়। তবে দিনশেষে এই সিরিজ আপনার মন জয় করবে, নাকি আরও কিছু পাওয়ার আক্ষেপ রেখে যাবে—সেই চূড়ান্ত রায় দেওয়ার ভার সম্পূর্ণভাবে দর্শকদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া শ্রেয়।