১ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলায় সব সরকারি কাজ হবে মাতৃভাষায়! বিধানসভায় ঐতিহাসিক ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

১ সেপ্টেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত স্তরে সরকারি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বাধ্যতামূলক করা হলো। রাজ্য বিধানসভায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এদিন বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে এই রাজ্যে সমস্ত সরকারি কাজে বাংলা ভাষাকে আবশ্যিক করা হচ্ছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অনুবাদক নিয়োগসহ বাকি সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাজ দ্রুত সেরে নেওয়া হবে। এখন থেকে যেমন বাংলায় সমস্ত সরকারি চিঠি দেওয়া হবে, তেমনই প্রয়োজন অনুসারে হিন্দিতেও যোগাযোগ রক্ষা করা হবে। রাজ্যের সমস্ত সরকারি ক্ষেত্রে নিজেদের মাতৃভাষাকে প্রশাসনিক কাজের মূল মাধ্যম হিসেবে প্রয়োগ করা হবে বলে জানান তিনি। শুধু তাই নয়, বাংলা ভাষার ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি তিনি কড়া নির্দেশ দিয়ে জানিয়ে দেন যে, সরকারি সব ধরনের যোগাযোগে একমাত্র বাংলা ভাষাকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি, নীতিগত নির্দেশ এবং সমস্ত অফিস অর্ডার নিখুঁতভাবে বাংলায় প্রকাশের বিষয়ের ওপর এবার থেকে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে।

এদিন বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আরও জানান যে, সম্প্রতি রাজ্যে এসে তাঁকে একটি বিশেষ চিঠি পাঠিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সেই চিঠির মূল বিষয়বস্তু এদিন জনসমক্ষে আনেন মুখ্যমন্ত্রী। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে রাজ্যে সমস্ত সরকারি কাজকর্মে বাংলা ভাষার প্রয়োগকে সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মত ছিল, প্রশাসনিক কাজ আরও স্বচ্ছ ও জনমুখী করতে বাংলা ভাষার বহুল ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেন্দ্রের সঙ্গে বিভিন্ন দপ্তরিক কাজের ক্ষেত্রে বাংলার পাশাপাশি হিন্দি ভাষার ব্যবহারও বাড়ানো যেতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী এপ্রসঙ্গে বলেন, ‘‘মাননীয় অমিত শাহ আমাকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পাঠিয়েছেন। চলতি বছর জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। তিনি ছিলেন ভারতীয় ভাষাগুলির সংরক্ষণ ও বিকাশের অন্যতম প্রধান পুরোধা। সাধারণ মানুষের কাজ যাতে সবসময় তাঁদের নিজেদের মাতৃভাষায় পরিচালিত হতে পারে, সেটাই ছিল তাঁর আজীবন স্বপ্ন।’’

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান যে, রাজ্যের ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর থেকে শুরু করে একেবারে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় (CMO) পর্যন্ত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম এবার থেকে সম্পূর্ণভাবে বাংলা ভাষাতেই সম্পন্ন করা হবে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক পরিষেবা, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় প্রশংসাপত্র প্রদান, সরকারি অ্যাপ, নাগরিক অধিকারের পরিসর, এফআইআর (FIR), সরকারি বিজ্ঞপ্তি—সবক্ষেত্রেই এবার থেকে বাংলা ভাষার ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে অপ্রয়োজনীয় বিদেশি ভাষার বদলে নিজেদের মাতৃভাষা বাংলাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘বিদেশি ভাষার মোহ ছেড়ে কেন্দ্রের সঙ্গে সমস্ত পত্রালাপ বাংলা ও রাজভাষাতেই করা যেতে পারে। প্রশাসনিক কাজ, নিখুঁত অনুবাদ এবং তার কার্যকর প্রয়োগ এখন থেকেই শুরু হবে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীর এই বিশেষ বর্ষে সরকারের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা নেবে। এটি কেবল সুশাসন প্রতিষ্ঠার পদক্ষপই নয়, এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধাও বহুগুণ বেড়ে যাবে।’’

উল্লেখ্য, গত রবিবার কলকাতায় একটি নামী সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মন্তব্য করেছিলেন যে, বাংলা খুব শীঘ্রই আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পেয়ে ‘সোনার বাংলা’ হয়ে ওঠার দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে জানিয়েছিলেন যে তিনি নিজে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুকে একটি চিঠি লিখেছেন যেখানে তাঁর মনের গভীর কথা ও শুভকামনা লেখা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন যে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর এই গঠনমূলক প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করবেন। এদিন বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অমিত শাহের সেই সুচিন্তিত প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ সম্মান জানিয়ে এবং জনকল্যাণের কথা মাথায় রেখেই রাজ্য সরকার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।