‘আমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না!’ ক্লাসের উজ্জ্বল নক্ষত্ররাই কি আজ চরম বিষাদের শিকার? এই ৭টি অস্বাভাবিক আচরণ দেখলেই সাবধান হন

আজকের প্রতিযোগিতামূলক যুগে বাবা-মায়েরা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে অনেক সময়ই বড় ভুল করে ফেলেন। স্কুলের ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া, ভালো নম্বর আনা কিংবা পরীক্ষার খাতায় আকাশছোঁয়া সাফল্যের ইঁদুরদৌড় দেখে অভিভাবকরা মনে করেন তাঁদের সন্তান বুঝি সম্পূর্ণ সুস্থ ও ভালো আছে। কিন্তু প্রখ্যাত শিশু মনোবিদ বা চাইল্ড সাইকোলজিস্টদের দীর্ঘ গবেষণা ও সতর্কবাণী বলছে সম্পূর্ণ অন্য কথা। বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে ঠিক তারাই, যাদের স্কুল ব্যাগ সবচেয়ে ভারী এবং খাতার নম্বর সবচেয়ে বেশি। অতিরিক্ত নম্বর ভালো থাকার চিরন্তন গ্যারান্টি দেয় না। অনেক সময় অবুঝ সন্তান মুখে বলতে পারে না যে সে ভালো নেই, কিন্তু তার দৈনন্দিন আচার-আচরণ ও ছোট্ট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সে বুঝিয়ে দেয় যে ভেতরে ভেতরে সে কতটা ভেঙে পড়েছে।
নম্বরের এই নির্মম প্রতিযোগিতার আড়ালে যে প্রথম এবং সবচেয়ে বড় লাল সংকেত বা রেড সিগন্যাল লুকিয়ে থাকে, তা হলো সন্তানের হঠাৎ করে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। অতীতে যে শিশুটি সারাদিন ঘরমুখো হয়ে বকবক করত, সে হঠাৎ করেই স্কুল থেকে ফিরে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকতে শুরু করে। খাবার টেবিলে দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা, প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া—এগুলি সাধারণ একা থাকতে চাওয়ার ইচ্ছে নয়, বরং কঠিন বাস্তব থেকে পালানোর এক মরিয়া চেষ্টা। এর পাশাপাশি দ্বিতীয় প্রধান লক্ষণ হলো তাদের দৈনন্দিন ঘুম ও খাওয়ার রুটিন একেবারে উল্টে যাওয়া। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে মোবাইল ফোন স্ক্রল করা, সকালে শত ডাকাডাকির পরেও বিছানা থেকে উঠতে না পারা কিংবা হঠাৎ করে খাওয়ার ইচ্ছা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলা কিংবা অতিরিক্ত খাওয়া—এই সমস্ত উপসর্গ স্পষ্ট নির্দেশ করে যে সন্তানের মনে তীব্র অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগ বাসা বেঁধেছে।
তৃতীয়ত, ছোটখাটো তুচ্ছ বিষয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় রেগে যাওয়া কিংবা কান্নায় ভেঙে পড়া। সামান্য একটি পেন্সিল হারিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কান্নাকাটি করা কিংবা সামান্য বকাঝকা করলেই নিজেকে অপরাধী ভেবে চিৎকার করে ওঠা বুঝিয়ে দেয় যে শিশুটি তার নিজের আবেগ বা ইমোশন আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। চতুর্থ বিপজ্জনক লক্ষণ হলো তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া চরম হীনমন্যতা, যেখানে তারা কথায় কথায় বলতে শুরু করে, “আমি আর পারব না” বা “আমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না”। যে ছাত্র বা ছাত্রী অতীতে অঙ্কে একশতে একশ পেত, সে-ই আজ সামান্য খাতা দেখেই আতঙ্কিত হয়ে বলে যে প্রশ্ন খুব কঠিন। ব্যর্থতার তীব্র ভয় তাদের গ্রাস করায় তারা চেষ্টা করাই ছেড়ে দেয়, যাকে মনোবিদদের ভাষায় পারফরম্যান্স অ্যাংজাইটি বলা হয়। পঞ্চম লক্ষণ হিসেবে দেখা যায় শরীরের নানা অজুহাত—পরীক্ষার ঠিক আগের মুহূর্তে কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই পেটে তীব্র ব্যথা, মাথার যন্ত্রণা কিংবা জ্বর, অথচ চিকিৎসকের কাছে গেলে শরীরে কোনো রোগ ধরা পড়ে না। এটি মূলত অবচেতন মন শরীরকে মাধ্যম বানিয়ে তার চরম স্ট্রেস প্রকাশ করে।
ষষ্ঠত, নিজেকে অন্য সতীর্থদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত তুলনা করে হীনমন্যতায় ভোগা। “ও ৯৯ পেয়েছে, আমি কেন ৯৫ পেলাম?—আমি অত্যন্ত খারাপ”—এই ধরনের মানসিকতা তাদের গ্রাস করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের ঝকঝকে ছবি দেখে নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করা এবং আত্মমর্যাদাকে শুধুমাত্র খাতার নম্বরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া এর অন্যতম কুফল। আর সবচেয়ে বড় ও চূড়ান্ত বিপদের সংকেত হলো আনন্দদায়ক বা শখের জিনিসেও বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকা। যে শিশুটি অতীতে ক্রিকেট খেলা, ছবি আঁকা কিংবা গান গাওয়ায় মগ্ন থাকত, আজ সেই একই শিশু সবকিছুর প্রতি উদাসীন হয়ে বলে যে কোনো কিছুই তার ভালো লাগছে না। জন্মদিন, উৎসব কিংবা পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার আনন্দও তাকে আর স্পর্শ করে না, যা সরাসরি ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের লক্ষণ।
এমতাবস্থায় সচেতন অভিভাবক হিসেবে আপনাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের ওপর নম্বরের পাহাড় চাপিয়ে না দিয়ে তার ঐকান্তিক চেষ্টার প্রশংসা করুন। পরীক্ষায় কম নম্বর পেলেও তাকে ভরসা জোগান যে সে অনেক পরিশ্রম করেছে। প্রতিদিন অন্তত পনেরো মিনিট স্মার্টফোন বা গ্যাজেট দূরে সরিয়ে রেখে সন্তানের মুখোমুখি বসে তার স্কুলের দিনের মজার ঘটনাগুলো নিয়ে গল্প করুন। সন্তান কোনো ভুল করলে তাকে বকাঝকা না করে স্নেহের হাত বাড়িয়ে পাশে দাঁড়ান। সবসময় মনে রাখবেন, আপনার সন্তান কোনো রক্তমাংসহীন রিপোর্ট কার্ড নয়, সে একজন সংবেদনশীল মানুষ। জীবনের লড়াইয়ে ভালো রেজাল্ট বা আকাদেমিমক সাফল্য প্রয়োজন ঠিকই, তবে তার থেকেও অনেক বেশি জরুরি হলো সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য ও ভালো থাকা। তাই পরীক্ষার খাতায় বড় বড় A+ পাওয়ার আগে সন্তানের হৃদয়ের Attitude, Affection এবং Assurance—এই তিনটি মূল্যবান দিক অবশ্যই যাচাই করে নিন।