ট্রেনে উঠেই কম্বল ব্যাগে ভরছেন? ১০০ কোটি বাঁচাতে এসি কোচে আসছে হাই-টেক QR কোড, নজরেই ধরবে রেল!

চেনা পরিচিত সেই চিরন্তন দৃশ্য—ভোরবেলা স্টেশনে ট্রেন ঢোকার আগেই সিটের কম্বল গায়েব, আর জানলার ধারের ভদ্রলোক একটু ফোলা ব্যাগ নিয়ে চটজলদি চম্পট দিলেন। ‘একটা কম্বল আর এমন কী!’—এই মানসিকতার বশে ভারতীয় রেলকে প্রতি বছর শত কোটি টাকার বেশি আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হয়। এসি কোচের যাত্রীদের হাত ধরে চাদর, বালিশের কভার, তোয়ালে থেকে শুরু করে বহুমূল্য কম্বল পর্যন্ত নিয়মিত গায়েব হয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা রুখতে বারবার নোটিস জারি, মোটা অংকের জরিমানা কিংবা রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (RPF)-এর ধরপাকড় চালিয়েও স্থায়ী কোনো সুরাহা মেলেনি। যাত্রীদের এই অভ্যাস বদলাতে এবং রেলের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি সুরক্ষিত করতে এবার একেবারে কড়া প্রযুক্তির পথ বেছে নিয়েছে ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষ।
রেলের এই নতুন ও যুগান্তকারী পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের সমস্ত এসি কোচের লিনেনে বসানো হতে চলেছে একটি করে ইউনিক কিউআর কোড (QR Code)। অর্থাৎ, আপনার গায়ে জড়ানো সামান্য কম্বলটিরও এবার থেকে একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয়পত্র থাকবে। প্রতিটি চাদর, কম্বল এবং বালিশের কভারে আলাদা সিরিয়াল নম্বর সম্বলিত এই কোড এম্বেড করা থাকবে। পুরো প্রক্রিয়াটি হবে আধুনিক কুরিয়ার সার্ভিসের মতো নিখুঁত। ট্রেন ছাড়ার নির্দিষ্ট সময়ের আগে কোচের অ্যাটেন্ডেন্ট একটি বিশেষ হ্যান্ডহেল্ড অ্যাপের মাধ্যমে কিউআর কোড স্ক্যান করে তা আপনার নির্দিষ্ট সিট নম্বরের সাথে ট্যাগ করে দেবেন এবং আপনি সই করে তা বুঝে নেবেন। একইভাবে, গন্তব্যে পৌঁছানোর ঠিক আধ ঘণ্টা আগে অ্যাটেন্ডেন্ট এসে স্ক্যান করে তা ফেরত বুঝে নেবেন।
এই ব্যবস্থার আসল চমক লুকিয়ে রয়েছে বড় বড় স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের এক্সিট গেটে। প্রতিটি এক্সিট গেটে বসানো হবে অত্যাধুনিক হাই-পাওয়ার কিউআর স্ক্যানার। কোনো যাত্রী যদি অসৎ উদ্দেশ্যে কম্বল বা চাদর ব্যাগে ভরে স্টেশন চত্বর ছেড়ে বেরোনোর চেষ্টা করেন, তবে গেটের স্ক্যানার মুহূর্তের মধ্যে তা ধরে ফেলবে। তৎক্ষণাৎ সাইরেনের মতো জোরে অ্যালার্ম বেজে উঠবে এবং সরাসরি রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্সের (RPF) সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুমে অটোমেটিক নোটিফিকেশন পৌঁছে যাবে। হাতেনাতে ধরা পড়লে কেবল কড়া জরিমানা তো বটেই, সাথে আইনি ব্যবস্থার মুখেও পড়তে হবে। রেলের এক সিনিয়র আধিকারিক জানিয়েছেন যে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কেবল চুরি বন্ধ করাই নয়; বরং কিউআর কোড স্ক্যান করলেই মুহূর্তের মধ্যে জানা যাবে কম্বলটি কোন ট্রেনের, কোন ডিপোর, কত তারিখে শেষবার ধোয়া হয়েছে, কতবার ব্যবহার করা হয়েছে এবং কবে সেটির মেয়াদ শেষ হবে। এর ফলে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ “নোংরা বা অস্বাস্থ্যকর কম্বল দেওয়া হয়েছে”—এই সমস্যার চিরতরে অবসান ঘটবে এবং লিনেনের হাইজিন শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এই ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে যাত্রীরা সরাসরি তিনটি বড় সুবিধা পাবেন। প্রথমত, ট্রেনযাত্রীরা সবসময় শতভাগ পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত এবং ট্র্যাক করা লিনেন ব্যবহার করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, রেলের সম্পত্তি চুরি কমলে সামগ্রিক পরিচালন খরচ হ্রাস পাবে, যার ইতিবাচক প্রভাব টিকিটের ভাড়ার উপর পড়বে। তৃতীয়ত, লিনেন হারিয়ে যাওয়া বা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় কার গাফিলতি ছিল, তা নিয়ে আর কোনো অনর্থক ঝামেলা পোহাতে হবে না, কারণ সমস্ত ডেটা অ্যাপে সংরক্ষিত থাকবে। আগামী মে ২০২৬ থেকে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে দিল্লি-মুম্বাই রাজধানী, শতাব্দী এবং দুরন্ত এক্সপ্রেসে এই আধুনিক সিস্টেমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হতে চলেছে। প্রথম তিন মাসের পারফরম্যান্স খতিয়ে দেখার পর ধাপে ধাপে দেশের সমস্ত মেল এবং এক্সপ্রেস ট্রেনগুলিতেও এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। প্রযুক্তির কড়া পাহারায় যাত্রীদের অভ্যাসে পরিবর্তন আনা হয়তো কিছুটা কঠিন, তবে দেশের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি বাঁচাতে এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।