মা হতে গিয়েও বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন? অলক্ষ্যে থাকা এই ছোট্ট ‘প্রজাপতি’ গ্রন্থিটিই আসল বাধা নয় তো?

মা হওয়ার সাধ জাগলেও অনেক নারীই দীর্ঘদিন চেষ্টা করে গর্ভধারণে সফল হতে পারেন না। এই ব্যর্থতার পর অনেকেই ভেঙে পড়েন, ছোটেন বন্ধ্যাত্বের দামি দামি চিকিৎসায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নেপথ্যের আসল অপরাধীটি চোখের আড়ালেই থেকে যায়। চিকিৎসকদের মতে, আমাদের গলায় থাকা প্রজাপতির মতো আকৃতির ছোট্ট একটি গ্রন্থি— থাইরয়েড (Thyroid)— প্রজনন স্বাস্থ্য বা ফার্টিলিটির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। অনিয়মিত পিরিয়ডস, বারবার গর্ভপাত কিংবা আইভিএফ (IVF) ব্যর্থ হওয়ার পেছনে থাইরয়েডের হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা এক বড় কারণ, যা বেশিরভাগ নারীই বুঝতে পারেন না।
📊 প্রজনন ক্ষমতায় থাইরয়েডের ভূমিকা ও ২০২৫-এর গবেষণা
থাইরয়েড গ্রন্থিটি দেখতে ছোট হলেও এটি আমাদের শরীরের মেটাবলিজম, শক্তি, ওজন, মেজাজ এবং বিশেষ করে প্রজনন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।
Journal of Clinical Medicine Research-এ প্রকাশিত ২০২৫ সালের একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সন্তান ধারণের চেষ্টাকারী দম্পতিদের মধ্যে প্রায় ১৫-২০% বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভুগছেন। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই বন্ধ্যা দম্পতিদের মধ্যে ৫-১০% ক্ষেত্রে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে থাইরয়েডের সমস্যা। এই কারণেই যেকোনো ফার্টিলিটি চিকিৎসার একদম শুরুতে ডাক্তাররা থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন।
⚠️ থাইরয়েডের নিষ্ক্রিয়তা বা ‘হাইপোথাইরয়েডিজম’ (হরমোন কম থাকা)
মহিলাদের প্রজনন ক্ষমতায় সবচেয়ে বেশি বাধা সৃষ্টি করে এই হাইপোথাইরয়েডিজম। থাইরয়েড হরমোন কমে গেলে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নিঃসরণ বা ওভুলেশন (Ovulation) অনিয়মিত হয়ে পড়ে, কিংবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। আর ওভুলেশন না হলে গর্ভধারণ হওয়া অসম্ভব।
যে লক্ষণগুলো দেখলেই সতর্ক হবেন:
অনিয়মিত পিরিয়ডস, অতিরিক্ত রক্তপাত বা অনেক দেরিতে পিরিয়ডস হওয়া।
গর্ভপাতের (Miscarriage) ঝুঁকি হঠাৎ বেড়ে যাওয়া।
পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রাম সত্ত্বেও একটানা ক্লান্তি, দ্রুত ওজন বৃদ্ধি ও চুল পড়া।
কোষ্ঠকাঠিন্য, খসখসে ত্বক ও অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা লাগা।
মনে রাখবেন, অনেক নারীর ক্ষেত্রে কিন্তু কোনো বাহ্যিক লক্ষণই প্রকাশ পায় না। তাই রক্ত পরীক্ষাই একমাত্র ভরসা।
⚠️ থাইরয়েডের অতি-সক্রিয়তা বা ‘হাইপারথাইরয়েডিজম’ (হরমোন বেশি থাকা)
হরমোনের মাত্রা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি থাকলেও তা প্রজনন ক্ষমতার মারাত্মক ক্ষতি করে। এর ফলে নারীদের পিরিয়ডসের পরিমাণ খুব কমে যায়, ডিম্বস্ফোটন ব্যাহত হয় এবং গর্ভপাতের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
এই লক্ষণগুলো খেয়াল রাখুন:
ভালোভাবে খাওয়া-দাওয়া করা সত্ত্বেও আচমকা ওজন কমে যাওয়া।
বুক ধড়ফড় করা, অতিরিক্ত উদ্বেগ বা প্যানিক অ্যাটাক হওয়া।
অস্বাভাবিক গরম লাগা, অতিরিক্ত ঘাম ও হাত-পা কাঁপুনি।
🤰 গর্ভধারণের পরেও কি থাইরয়েডের গুরুত্ব আছে?
অবশ্যই আছে! থাইরয়েডের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না এনে গর্ভধারণ করলে গর্ভাবস্থার প্রাথমিক পর্যায়েই গর্ভপাত, নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্রসব (Preterm Delivery) এবং গর্ভস্থ শিশুর উচ্চ রক্তচাপ বা শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই যাদের বারবার গর্ভপাত হচ্ছে বা আইভিএফ (IVF) চক্র ব্যর্থ হয়েছে, তাদের চিকিৎসার প্রথম ধাপই হওয়া উচিত থাইরয়েড পরীক্ষা।
🩺 সমাধান কি জটিল?
একেবারেই নয়! সুখের কথা হলো, থাইরয়েড রোগ নির্ণয় করা যেমন সহজ, এর চিকিৎসাও ঠিক ততটাই সহজ ও সাশ্রয়ী। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন সকালে একটি নির্দিষ্ট ডোজের হরমোন ট্যাবলেট খেলে এবং জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন আনলে হরমোনের মাত্রা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়। এর ফলে নারীদের ওভুলেশন বা ডিম্বস্ফোটন পুনরায় নিয়মিত শুরু হয় এবং প্রাকৃতিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। এমনকি আইইউআই (IUI) বা আইভিএফ (IVF) চিকিৎসার সাফল্যের হারও এতে অনেকখানি বৃদ্ধি পায়।
সম্পাদকের শেষ কথা: সন্তান ধারণের দীর্ঘ লড়াইয়ে হতাশ না হয়ে আজই আপনার হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করুন। একটি ছোট্ট রক্ত পরীক্ষাই হয়তো আপনার মাতৃত্বের স্বপ্ন পূরণের চাবিকাঠি হতে পারে!