সুন্দরবনে ফের প্রকৃতির রুদ্ররূপ! বাঁধ ভেঙে গোবর্ধনপুরে গ্রামে ঢুকলো সমুদ্রের নোনা জল, তলিয়ে গেল ৩০০ বিঘা জমি

সুন্দরবনের উপকূলবর্তী এলাকায় আবারও ফিরে এল সেই পরিচিত আতঙ্ক। শুক্রবার ভরা কোটালের জোয়ারের সময় পাথরপ্রতিমা ব্লকের জি-প্লট গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত গোবর্ধনপুর এলাকায় সমুদ্র বাঁধ ভেঙে প্রবল গতিতে গ্রামে ঢুকে পড়ল নোনা জল। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে ধুঁকতে থাকা এই বাঁধ যেন প্রকৃতির রোষের সামনে ছিল অসহায়। মুহূর্তের মধ্যে নোনা জলের দাপটে জলমগ্ন হয়ে পড়ল বিস্তীর্ণ এলাকা, যা স্থানীয়দের মনে তৈরি করেছে এক গভীর সংকট।

স্থানীয় সূত্রে খবর, গোবর্ধনপুর গ্রামের পূর্ব-পশ্চিম দিকের প্রায় ১,২০০ মিটার দীর্ঘ সমুদ্র বাঁধটি দীর্ঘদিন ধরেই বিপজ্জনক অবস্থায় ছিল। বৃহস্পতিবারের জোয়ারে সেই দুর্বল বাঁধের বাঁধন ছিঁড়ে নোনা জল লোকালয়ে প্রবেশ করে। এর ফলে প্রায় ৩০০ বিঘা কৃষিজমি জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। মাথায় হাত পড়েছে কৃষকদের, কারণ সদ্য বপন করা ধানের বীজতলা নোনা জলে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এক মরশুমের চাষের স্বপ্ন জলের তোড়ে ভেসে যাওয়ায় কৃষকদের এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হচ্ছে। পাশাপাশি মৎস্যচাষিদের অবস্থাও তথৈবচ। একাধিক পুকুর প্লাবিত হওয়ায় চাষ করা মাছ নোনা জলে মরে ভেসে উঠেছে বা ভেসে বেরিয়ে গিয়েছে, যা মৎস্যজীবীদের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।

গোবর্ধনপুরের দুর্দশা এখানেই শেষ নয়। নোনা জলের প্রকোপে অন্তত ৫০টি বাড়ি জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারই প্রাণভয়ে ঘরের আসবাবপত্র ও খাদ্যসামগ্রী সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মনতোষ গুড়িয়া ক্ষোভের সুরে জানান, “প্রতিবার কোটাল বা বর্ষার সময় আমাদের এই একই ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। প্রশাসনকে বারবার জানানো সত্ত্বেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের বদলে প্রতিবারই দায়সারা মেরামতির কাজ করা হয়েছে। এভাবে চললে অদূর ভবিষ্যতে গোবর্ধনপুর মানচিত্র থেকেই মুছে যাবে।” এই অবস্থায় একটি নলকূপ নোনা জলের নিচে চলে যাওয়ায় এলাকায় তীব্র পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে, যা শিশু ও প্রবীণদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনের আধিকারিকরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রাজ্য সরকার দ্রুত ত্রাণ এবং বিশুদ্ধ পানীয় জল পাঠানোর কাজ শুরু করেছে। সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী দীপঙ্কর জানা আশ্বাস দিয়েছেন যে, প্রশাসন পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় অস্থায়ী বাঁধ মেরামতির কাজ শুরু করা হবে। তবে গ্রামবাসীদের দাবি, কেবল অস্থায়ী মেরামতিই নয়, প্রয়োজন একটি শক্তপোক্ত স্থায়ী সমুদ্র বাঁধ।

সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষায় সমুদ্র বাঁধ যে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ, গোবর্ধনপুরের ঘটনা তা আবারও প্রমাণ করল। একদিকে সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন এবং অন্যদিকে দুর্বল পরিকাঠামো— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে সুন্দরবনের মানুষ আজ চরম সংকটের মুখে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থায়ী সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, বাসিন্দারা এখন বাস্তবের মাটির বাঁধ মজবুত হওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। যদি দ্রুত স্থায়ী সমাধান না হয়, তবে আগামী ভরা জোয়ারে আরও বড় বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা অমূলক নয়।