চোখের সামনেই পুলকারকে পিষে নিয়ে গেল ট্রেন! গেটম্যানের ভুলে মুর্শিদাবাদে ভয়াবহ মৃত্যুমিছিল

মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ ও গোবিন্দপুর স্টেশনের মধ্যবর্তী লেভেল ক্রসিংয়ে আজ সকালে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শিউরে উঠেছে গোটা রাজ্য। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন স্কুল পড়ুয়া এবং এক সাইকেল আরোহী। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টা নাগাদ এই লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় একটি পুলকার পুরোপুরি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণভাবে রেল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির ফসল।
ঘটনাস্থলে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান থেকে জানা যায়, সকালের দিকে নবদ্বীপ লাইনের একটি আপ ট্রেন ওই রেললাইন দিয়ে পার হওয়ার সময় গেটটি বন্ধ ছিল। ট্রেনটি চলে যাওয়ার পর গেটম্যান রেলগেটটি তুলে দেন। স্বাভাবিকভাবেই গেট খোলার পর আটকে থাকা গাড়ি এবং পথচারীরা রেললাইন পার হতে শুরু করেন। কিন্তু সেই মুহূর্তেই ফের রেলগেটটি নামিয়ে দেওয়া হয়। এই দ্রুত পরিবর্তনের ফলে লাইনের ওপর আটকে পড়ে পড়ুয়াবাহী পুলকারটি এবং এক সাইকেল আরোহী। ঠিক সেই সময়েই উল্টোদিক থেকে তীব্র গতিতে চলে আসে নিমতিতা প্যাসেঞ্জার ট্রেন। চলন্ত ট্রেনটি পুলকারটিকে সজোরে ধাক্কা মেরে রেললাইন বরাবর প্রায় ৫০ ফুট টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই সাইকেল আরোহী এবং কয়েকজন পড়ুয়ার মর্মান্তিক মৃত্যু হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর এলাকাটিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়িটি রেলগেট থেকে ৫০ ফুট দূরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, যেখানে তাদের চিকিৎসা চলছে। এই দুর্ঘটনার খবর পৌঁছাতেই বহরমপুরের বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র এবং প্রাক্তন রেল প্রতিমন্ত্রী তথা প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী ঘটনাস্থলে ছুটে যান। হাসপাতালে গিয়ে আহত পড়ুয়াদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন তাঁরা।
তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সুব্রত মৈত্র বলেন, “কীভাবে এত বড় গাফিলতি হতে পারে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। গেটম্যানের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে আজ প্রাণ গেল বহু নিষ্পাপ শিশুর। আমরা এই ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করছি।” অন্যদিকে, প্রাক্তন রেল প্রতিমন্ত্রী অধীর চৌধুরী সুর চড়িয়ে বলেন, “রেলের এই রুটে নিরাপত্তার কোনো বালাই নেই। মানুষ আজ রেলের গাফিলতির বলি হচ্ছে। এটি একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা।”
ঘটনার ভয়াবহতা স্বীকার করে পূর্ব রেলের পক্ষ থেকে তড়িঘড়ি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গেটম্যানের ভুল নাকি যান্ত্রিক ত্রুটি—ঠিক কোথায় খামতি ছিল, তা খতিয়ে দেখতে ডিআরএম পর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। এলাকাটিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং স্থানীয়রা রেলের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি তুলেছেন। সকালের এই দুর্ঘটনাটি কেবল একটি যান্ত্রিক বিচ্যুতি নয়, বরং রেলের সুরক্ষা বলয়ের বড় ধরনের ব্যর্থতা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঘাতক ট্রেন ও দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়িটির ধ্বংসাবশেষ এখন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে পুরো রেল ব্যবস্থাকে। পরিবারগুলোর আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে মুর্শিদাবাদের বাতাস।