‘লাগেজ-ব্যাগেজ’ তত্ত্বের পাল্টা অনুব্রতর বিস্ফোরণ! তৃণমূলের ঘর ভেঙে তৈরি হচ্ছে কোন নতুন সমীকরণ?

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহলে এখন ভাঙনের সুর প্রবল। গত কয়েকদিনে রাজ্যের শাসকদলের একের পর এক হেভিওয়েট নেতার দলত্যাগ ও নতুন শিবিরে যোগদান রাজ্য রাজনীতিতে এক বড়সড় তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ও অনুব্রত মণ্ডলের পর এবার এই তালিকায় নতুন সংযোজন মদন মিত্র। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এই নেতারা একে একে কালিঘাটের সঙ্গ ছেড়ে যোগ দিচ্ছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরে। রাজ্য রাজনীতির এই হঠাৎ বাঁকবদলকে ‘১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া’ হিসেবেই বর্ণনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নেতাদের এই দলবদল কেবল রাজ্য রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তৃণমূলের কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে অনুব্রত মণ্ডলের মতো নেতার প্রকাশ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কাঠগড়ায় তোলা দলের অভ্যন্তরে তীব্র অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। কালীঘাটের অন্দরমহলে যখন এই ভাঙনের খবর পৌঁছাচ্ছে, তখন দলের অন্দরে তৈরি হয়েছে চরম উত্তেজনা। মদন মিত্রের মতো একজন জনপ্রিয় নেতার শিবির বদল তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখন থেকেই জল্পনা তুঙ্গে।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রাজনৈতিক দলবদলকে অত্যন্ত কঠোরভাবে দেখছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা দল ছেড়ে যাচ্ছেন, তাদের অনেক ‘লাগেজ-ব্যাগেজ’ বা দুর্নীতির বোঝা রয়েছে। নেত্রীর দাবি, “যাঁদেরই এই ধরনের বোঝা বা ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে, তাঁরাই শেষ পর্যন্ত বিজেপির কোলে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন যে, নেতাদের এই দলত্যাগ নেপথ্যে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়েও ব্যক্তিগত স্বার্থরক্ষার লড়াই বেশি কাজ করছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের এই ধারাবাহিক ভাঙন আগামী দিনে রাজ্যের ক্ষমতা দখল বা ধরে রাখার লড়াইয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দলের নিচুতলার সংগঠনকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই দলের প্রথম সারির নেতাদের এভাবে চলে যাওয়া তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই দলবদলের ঢেউ তৃণমূলকে কতখানি দুর্বল করতে পারে, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।
তৃণমূলের এই ভাঙন কি রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির নতুন মেরুকরণ ঘটাবে? নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের একবার তার ক্যারিশমায় এই ভাঙন রোধ করে ঘুরে দাঁড়াবেন? উত্তর দেবে সময়, কিন্তু বর্তমানের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা যে রাজ্যকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। তৃণমূলের এই ‘লাগেজ-ব্যাগেজ’ তত্ত্ব এবং তার ফলে হওয়া ভাঙন এখন রাজ্যের প্রতিটি স্তরে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে। দলত্যাগী নেতারা একদিকে যেমন পদ ও প্রতিপত্তি পাচ্ছেন, অন্যদিকে তৃণমূল শিবির তাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবেই দেগে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতির জেরে তৃণমূলের অন্দরে এখন কার্যত অঘোষিত গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।