প্রধান শিক্ষক গায়েব, হাজিরা খাতায় সই! হরিহরপাড়ার স্কুলের ‘প্রক্সি’ সংস্কৃতিতে তোলপাড়

সরকারি স্কুলের বেহাল পরিকাঠামো নিয়ে রাজ্যে অভিযোগের অন্ত নেই, কিন্তু মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার বহড়ান জুনিয়র হাই স্কুলের ঘটনা সমস্ত নজিরকে ছাপিয়ে গেল। যেখানে সরকারি বেতনভোগী শিক্ষকরা স্কুলে আসেন না, কিন্তু হাজিরা খাতায় সই থাকে জ্বলজ্বল করছে। আর তাঁদের বদলে ক্লাসরুমে ক্লাস নিচ্ছেন ‘প্রক্সি’ শিক্ষক!

হরিহরপাড়া ব্লকের এই স্কুলে ছাত্র সংখ্যা ৮০ জন, আর শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৩ জন। বুধবার দুপুর ১২টার সময় স্কুলে গিয়ে দেখা গেল প্রধান শিক্ষক অলোক কুমার পাল, শিক্ষিকা মিঠু বিশ্বাস এবং অতিথি শিক্ষক পরিমলের দেখা নেই। অথচ হাজিরা খাতায় তাঁরা উপস্থিত! কিন্তু স্কুলের ক্লাস চলছে পুরোদমে। কারা নিচ্ছেন সেই ক্লাস? তাঁরা হলেন গ্রামের বাসিন্দা বলরাম মন্ডল, জনার্দন সরকার এবং ইয়াসমিনারা খাতুন। বেতনভুক শিক্ষকরা নিজেদের পকেট থেকে ১০০০ টাকা করে দিয়ে এই তিনজনকে ‘প্রক্সি’ শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেছেন।

ষাটোর্ধ্ব বলরাম বাবু বা জনার্দন বাবু কিংবা তরুণী ইয়াসমিনারা—যাঁদের কোনো পেশাদার শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ বা যোগ্যতা নেই, তাঁরাই এখন এই বিদ্যালয়ের ভরসা। অভিযোগ, সরকারি বেতনভোগী শিক্ষকরা স্কুলে না এসেও সরকারি সুবিধা ভোগ করছেন, আর গ্রামের মানুষদের শখের বশে ক্লাস করানোর ফলে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ইয়াসমিনারা জানিয়েছেন, স্কুলে অঙ্কের কোনো শিক্ষক নেই, তাই বাধ্য হয়েই তিনি পড়ান।

প্রধান শিক্ষক অলোক কুমার পালের সাফাই, পা ভেঙে যাওয়ার কারণে তিনি দীর্ঘদিন স্কুলে আসতে পারেননি। বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে ছোটাছুটি করতে গিয়ে তাঁর শারীরিক সমস্যা বেড়েছে। তবে এমন অদ্ভুত যুক্তিতেও ক্ষোভ কমছে না অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের। যোগ্যতাহীন ব্যক্তিদের দিয়ে পঠনপাঠন করানোর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, এটি কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নয়, বরং সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার চরম অবক্ষয়।

কেন নজরদারি নেই প্রশাসনের? কেন অভিভাবকরা সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন, তার উত্তর এই ঘটনাতেই স্পষ্ট। সরকারি শিক্ষকদের এই চরম দায়বদ্ধতার অভাব আগামী দিনে ৮০ জন ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবনে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চিন্তিত স্থানীয়রা। অবিলম্বে এই ‘প্রক্সি’ শিক্ষক প্রথার অবসান এবং দোষী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা।