স্মার্টফোনের চেয়েও কম আয়ু! মাত্র ২ বছরের মধ্যেই কেন চীনের রাস্তায় পুরোনো হচ্ছে বৈদ্যুতিক গাড়ি?

প্রযুক্তির দ্রুত উৎকর্ষের যুগে স্মার্টফোন বদলে ফেলা এখন খুবই সাধারণ বিষয়। কিন্তু আপনি কি জানেন, চীনে একটি ইলেকট্রিক গাড়ির (ইভি) গড় আয়ু এখন মাত্র ১.৮ বছর? ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের রাস্তায় চলাচলকারী বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোর স্থায়িত্ব বর্তমানে অনেক মোবাইল ফোনের চেয়েও কম। অথচ দেশটিতে সাধারণ পেট্রোল বা ডিজেল চালিত গাড়ির গড় আয়ু ৮.২ বছর। অর্থাৎ, জীবাশ্ম জ্বালানির গাড়ির তুলনায় ইলেকট্রিক গাড়িগুলো অত্যন্ত দ্রুত প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। চায়না অ্যাসোসিয়েশন অফ অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স (CAAM) এবং হেজুন কনসাল্টিং-এর তথ্য বিশ্লেষণে এই বিষয়টি উঠে এসেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন চীনের মানুষ এত দ্রুত তাদের গাড়ি বদলাচ্ছেন? এর প্রধান কারণ হলো প্রযুক্তির অভাবনীয় পরিবর্তন। বর্তমানে ইভি প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো দ্রুতগতিতে নতুন মডেল বাজারে আনছে। ব্যাটারির কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, সফটওয়্যার আপডেট এবং নতুন সব স্মার্ট চিপের ব্যবহারের ফলে পুরোনো মডেলগুলো খুব দ্রুতই সেকেলে হয়ে পড়ছে। ক্রেতারা তাদের পুরোনো গাড়ি বিক্রি করে নতুন প্রযুক্তিসম্পন্ন গাড়ির দিকে ঝুঁকে পড়ছেন, কারণ নতুন ফিচারগুলোর সহজলভ্যতা তাদের আকর্ষণ করছে।
ইলেকট্রিক গাড়ির দ্রুত পুরোনো হয়ে যাওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো সেগুলোর পুনঃবিক্রয় মূল্য বা রিসেল ভ্যালু। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একটি ইভি কেনার মাত্র তিন বছরের মধ্যে সেটির দাম কমে মূল্যের প্রায় ৪৩.৩৫ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ, কেউ যদি ২০ লাখ টাকায় একটি ইভি কেনেন, তিন বছর পর সেটি বিক্রি করতে গেলে তার দাম ৮.৫ থেকে ৯ লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছায়। এই ব্যাপক আর্থিক অবমূল্যায়ন এড়াতে অনেক ক্রেতাই সময়ের আগেই গাড়ি বদলে ফেলাকে বুদ্ধিমত্তার কাজ বলে মনে করছেন।
এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো ৩৫ বছরের কম বয়সী তরুণ ক্রেতারা। চীনের অটোমোবাইল প্ল্যাটফর্ম ‘ডংচেডি’-র জরিপ বলছে, এই প্রজন্মের কাছে গাড়ি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং স্মার্ট ড্রাইভিং সিস্টেম, বড় টাচস্ক্রিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ফিচার এবং উন্নত ডিজিটাল অভিজ্ঞতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪৩ শতাংশ ইভি মালিক জানিয়েছেন, শুধুমাত্র অত্যাধুনিক স্মার্ট ফিচার এবং ইউজার এক্সপেরিয়েন্সের জন্যই তারা ঘন ঘন গাড়ি আপগ্রেড করেন।
একদিকে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং অন্যদিকে রিসেল ভ্যালুর দ্রুত হ্রাস—এই দুইয়ের সমন্বয়ে চীনের ইভি বাজারে এক অস্থির কিন্তু আধুনিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। স্মার্টফোনের মতো গাড়িকে যখন প্রযুক্তিপণ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার আয়ুষ্কাল কমে আসছে। চীনের এই মডেলটি ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অটোমোবাইল খাতের ওপর কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।