ডিজিটাল যুগেও ব্রিটিশ আমলের মানচিত্র! কলকাতা পুরনিগমের জমি জরিপ ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ

বিশ্ব যখন স্যাটেলাইট, জিপিএস এবং ড্রোন ম্যাপিংয়ের যুগে পৌঁছেছে, তখন ডিজিটাল কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকার জমি জরিপে আজও ভরসা সেই ব্রিটিশ আমলের জরাজীর্ণ মানচিত্র। ১৯০৩ থেকে ১৯০৭ সালের ক্যাডাস্ট্রাল ম্যাপ এবং ১৯২৮ সালের মৌজা মানচিত্র ব্যবহার করেই আজও কাজ চালাচ্ছে কলকাতা পুরনিগমের ভ্যালুয়ার অ্যান্ড সার্ভেয়ার বিভাগ। আর এই শতবর্ষ পুরনো নথির অস্পষ্টতাকে পুঁজি করেই শহরে দানা বাঁধছে জমি সংক্রান্ত বেনিয়ম, দুর্নীতি এবং চূড়ান্ত হয়রানি।
সম্প্রতি তরাতলা নির্মাণ-কাণ্ডের পর শহরের নির্মাণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুরপ্রশাসক স্মিতা পাণ্ডের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন লাইসেন্সড বিল্ডিং সার্ভেয়ারদের (এলবিএস) প্রতিনিধিরা। সেখানেই তাঁরা অভিযোগ করেন, গত একশো বছরে শহরের ভূপ্রকৃতি আমূল বদলে গেলেও নথিপত্রে তার কোনো প্রতিফলন নেই। পুরনো মানচিত্রে জমির সীমানা অস্পষ্ট হওয়ায় কোথাও জলাভূমি বাস্তুভিটে হিসেবে নথিভুক্ত হচ্ছে, আবার কোথাও বসতজমিই সরকারি খাতায় জলাজমি হয়ে থাকছে। সার্ভেয়ারদের দাবি, এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়েই এক অসাধু চক্র সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনে বাধ্য করছে।
এই জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে পুরনিগমে অবিলম্বে স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ‘রিমোট সেন্সিং’ প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি তুলেছেন সার্ভেয়াররা। তাঁদের মতে, এই আধুনিক প্রযুক্তিতে জমির অবস্থান, সীমানা, জলাভূমি এবং পরিবেশগত চরিত্র নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব। যদিও পুরনিগম সূত্রে জানা গেছে, এর আগে আইআইটি খড়গপুর বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিগত সহায়তায় ডিজিটাল ম্যাপিংয়ের পরিকল্পনা করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে শহরের ১০০টি ওয়ার্ডে জিআইএস-ভিত্তিক মানচিত্র থাকলেও, সংযুক্ত এলাকাগুলি আজও সেই ব্রিটিশ আমলের নকশার ওপরই নির্ভরশীল।
বৈঠকে প্রশাসনিক সংস্কারের একাধিক প্রস্তাব দিয়েছেন সার্ভেয়াররা। নির্মাণ শুরুর আগে ‘কমেন্সমেন্ট নোটিস’ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বাড়িওয়ালা ও পুরনিগমের দায়িত্ব স্পষ্ট করে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পুরপ্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে এই প্রস্তাবগুলি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। ইতিমধ্যে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে যুগ্ম কমিশনার পদমর্যাদার এক আধিকারিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ আমলের মানচিত্রের ওপর এই নির্ভরতা কি তবে প্রশাসনিক ব্যর্থতা নাকি দুর্নীতির কৌশল? তরাতলা কাণ্ডের পর এই প্রশ্নই এখন জোরালো হয়ে উঠেছে শহরজুড়ে।