পরিবেশ নাকি পরিকাঠামো? জলাভূমি বিধিনিষেধের বেড়াজালে ধুঁকছে দেড় লক্ষ জীবন, বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার দাবি

পূর্ব কলকাতা জলাভূমি বা ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ডস অঞ্চলের বিধিনিষেধের জালে জড়িয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটাতে এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে রাজ্য সরকারের কাছে একটি জোরালো স্মারকলিপি জমা দিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পূর্ব কলকাতা জলাভূমি ব্যবস্থাপনা এলাকার অন্তর্গত ৩৭টি মৌজার বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে ইন্দ্রজিৎ কুমার চন্দ এই স্মারকলিপিটি পেশ করেছেন।
বাসিন্দাদের মূল দাবি, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি এখানে বসবাসকারী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও পরিকাঠামোগত উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। স্মারকলিপিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঘোষিত জলাভূমি এলাকার বাসিন্দাদের একটি বিশাল অংশ তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। অথচ, কড়া বিধিনিষেধের কারণে তাঁরা সাধারণ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। নিজেদের মালিকানাধীন জমিতে বাড়ি নির্মাণ বা মেরামত, সীমানা প্রাচীর তৈরি, এমনকি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের মতো সাধারণ কাজগুলিও তাঁরা করতে পারছেন না। পাশাপাশি, রাস্তাঘাট, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং পানীয় জল সরবরাহের মতো সরকারি প্রকল্পগুলি বছরের পর বছর ধরে থমকে থাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
স্মারকলিপিতে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমান সীমানা নির্ধারণ পদ্ধতি পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল জলাভূমি এবং পুরনো গ্রাম বা কৃষি জমির মধ্যে যথাযথ পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। ‘ওয়েটল্যান্ডস (সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০১৭’-এর প্রসঙ্গ টেনে বাসিন্দারা দাবি করেছেন, বিদ্যমান মানচিত্র ও সীমানা অবিলম্বে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, জলাভূমির মূল এলাকাগুলোকে সুরক্ষিত রেখেই জনবসতিপূর্ণ ও কৃষি এলাকায় উন্নয়নের অনুমতি দেওয়া সম্ভব। এর জন্য উপগ্রহ-ভিত্তিক প্রযুক্তির সাহায্যে সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং ‘স্তরভিত্তিক জোনিং’ কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ইন্দ্রজিৎ কুমার চন্দ বলেন, “আমরা পূর্ব কলকাতা জলাভূমিকে অবশ্যই রক্ষা করতে চাই। কিন্তু যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে বসবাস করছেন, তাঁদের আবাসন ও পরিকাঠামো থেকে বঞ্চিত রাখা অন্যায়। আমরা এমন একটি বৈজ্ঞানিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান চাই যা পরিবেশ এবং স্থানীয় মানুষের অধিকার—উভয়কেই রক্ষা করবে।” স্থানীয় বাসিন্দাদের আশা, রাজ্য সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই দীর্ঘদিনের ভারসাম্যহীনতার একটি ইতিবাচক সুরাহা করবে। পরিবেশ সুরক্ষা ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানোই এখন এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।