সমুদ্রের ‘মেঘনাদ’ এবার নৌবাহিনীতে! শত্রুর রাডারে অদৃশ্য আইএনএস মহেন্দ্রগিরি, বাড়ল ভারতের শক্তি

ভারতীয় নৌবাহিনীর রণসজ্জায় যুক্ত হলো আরও এক শক্তিশালী ও আধুনিকতম সংযোজন— ‘আইএনএস মহেন্দ্রগিরি’। শনিবার বিশাখাপত্তনমের নৌঘাঁটিতে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্টেল্থ ফ্রিগেটটিকে নৌবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। মুম্বইয়ের মাজগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেডে তৈরি এই রণতরীটি ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘প্রজেক্ট ১৭ আলফা’ (P-17A) প্রকল্পের অধীনে নির্মিত ষষ্ঠ যুদ্ধজাহাজ।
পৌরাণিক কাহিনীতে মেঘনাদ যেমন মেঘের আড়ালে থেকে যুদ্ধ করতেন এবং শত্রুর চোখের আড়ালে থাকতেন, ঠিক সেই কৌশলেই তৈরি করা হয়েছে এই ফ্রিগেটটিকে। এর স্টেল্থ প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, এটি শত্রুপক্ষের রাডারে নিজের উপস্থিতি ধরা পড়তে দেয় না। ফলে সমুদ্রের বুকে শত্রু যখন কোনো কিছু টের পাওয়ার আগেই এই রণতরী তাকে পর্যুদস্ত করতে সক্ষম। যুদ্ধজাহাজটিতে বসানো হয়েছে বিধ্বংসী ব্রহ্মস ‘ভূমি থেকে ভূমি’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং শত্রুর আকাশপথে হামলা রুখতে রয়েছে অত্যাধুনিক ‘ভূমি থেকে আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। টানা ৫,৫০০ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন এই রণতরীটি সমুদ্রসীমার সুরক্ষায় এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হিসেবে কাজ করবে।
আইএনএস মহেন্দ্রগিরির আরেকটি বড় সাফল্যের দিক হলো এর দেশীয় নির্মাণশৈলী। এই জাহাজের ৭৫ শতাংশ উপাদানই ভারতে তৈরি, যা প্রধানমন্ত্রীর ‘আত্মনির্ভর ভারত’ গড়ার স্বপ্নের একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। ২০০-রও বেশি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি এই রণতরী গত ৩০ এপ্রিল থেকে আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরে সমুদ্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে ভারতীয় নৌবাহিনীর বহরে অন্তত ২০০টি যুদ্ধজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কলকাতার গার্ডেনরিচ এবং মুম্বইয়ের মাজগাঁও-সহ দেশের বিভিন্ন ডক ইয়ার্ডে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৫টি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। শুধু তাই নয়, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের আওতায় আরও ২ লক্ষ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৪টি নতুন যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজ তৈরির অনুমোদন মিলেছে। এই তালিকায় রয়েছে সাতটি পরবর্তী প্রজন্মের মাল্টি-রোল স্টেল্থ ফ্রিগেট এবং ন’টি ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন। এছাড়াও মাজগাঁও ডকে ‘প্রজেক্ট ১৮’ বা ‘নেক্সট জেনারেশন ডেস্ট্রয়ার’ (NGD) তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভারত মহাসাগরে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে ভারত যে তার নৌবাহিনীকে বিশ্বমানের করে তুলছে, আইএনএস মহেন্দ্রগিরির অন্তর্ভুক্তি তার এক শক্তিশালী বার্তা।