সর্ষের তেলে বিষ! পালামৌর সিক্কা গ্রামে পরপর মৃত্যুতে শোক, নেপথ্যে শিয়ালকাঁটার বিষক্রিয়া?

ঝাড়খণ্ডের পালামৌ জেলার পাডওয়া ব্লকের সিক্কা গ্রামে নেমে এসেছে চরম শোকের ছায়া। একটি পরিবারের একের পর এক সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যুতে প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত ২০ দিনে এই পরিবারের মোট ৬ জন সদস্যের মৃত্যু হয়েছে এবং সপ্তম জন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনায় স্বাস্থ্য বিভাগের প্রাথমিক অনুমান, দীর্ঘ ১৫ বছর পর ভারতে ফের ড্রপসি (Dropsy) রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

গত ১৯ জুন কুলদীপ মেহতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই মর্মান্তিক অধ্যায়ের সূত্রপাত হয়। এরপর একে একে ববিতা কুমারী (২০ জুন), ইন্দু কুমারী (২৬ জুন), শ্বেতা কুমারী (২৮ জুন), নকুল মেহতা (২৯ জুন) এবং সবশেষে পরিবারের প্রবীণতম সদস্যা লাখো দেবী (৮ জুলাই) প্রাণ হারান। পরিবারের সপ্তম সদস্য সুনীল মেহতা বর্তমানে আরআইএমএস (RIMS)-এ চিকিৎসাধীন। ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ তৎপর হয়ে উঠেছে। পাটন ব্লকের মেডিক্যাল আধিকারিক শ্রাবণ কুমার জানিয়েছেন, ভিসেরা রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে, যা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করবে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পরিবারের সদস্যরা যে সর্ষের তেল ব্যবহার করতেন, তাতে ‘আর্জিমোন মেক্সিকানা’ বা শিয়ালকাঁটা বীজের বিষক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে। রাঁচির ফুড টেস্টিং ল্যাবরেটরি থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টে সর্ষের তেলে এই বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতির কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং ড্রপসি রোগের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

ড্রপসি কী? এটি শরীরে অস্বাভাবিক জল জমার একটি অবস্থা, যা হার্ট, লিভার এবং কিডনির মতো অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভেজাল বা বিষাক্ত তেল খাওয়ার ফলে এই রোগ হানা দেয়। এর প্রধান লক্ষণগুলি হলো হাত, পা ও মুখ অস্বাভাবিক ফুলে যাওয়া, পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট এবং ত্বকের রং নীলচে বা কালচে হয়ে যাওয়া। আর্জিমোন মেক্সিকানা মূলত একটি কাঁটাযুক্ত আগাছা, যার বীজ দেখতে হুবহু সর্ষের দানার মতো। এই বীজের তেল সর্ষের তেলে মিশে গেলে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। এই বিষাক্ত তেল মূলত পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, মানুষের সেবনে এটি বিষের মতো কাজ করে।

বর্তমানে স্বাস্থ্য দপ্তর সমগ্র গ্রাম জুড়ে নজরদারি বাড়িয়েছে এবং আক্রান্তদের বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে, সাধারণ মানুষকে সর্ষের তেল কেনার সময় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ১৫ বছর পর ভারতে এই রোগের পুনরুত্থান এবং একটি পরিবারের ওপর এর ভয়াবহ আঘাত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রশাসনিক কঠোর পদক্ষেপের অপেক্ষায় এখন গোটা সিক্কা গ্রাম।