নক্ষত্রপতন! ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত কিংবদন্তি নাট্যকার ও নির্দেশক বিজয়া মেহতা, শোকের ছায়া বিনোদন জগতে।

থিয়েটার জগতের আকাশে এক বিশাল নক্ষত্রপতন ঘটল। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কাছে হার মেনে মঙ্গলবার রাতে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন প্রবীণ নাট্য নির্দেশক, অভিনেত্রী এবং ভারতীয় নাট্যমঞ্চের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বিজয়া মেহতা (Vijaya Mehta)। দক্ষিণ মুম্বইয়ের নিজের বাসভবনে প্রয়াত হলেন ‘বাই’ নামে পরিচিত এই কিংবদন্তি। তাঁর প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেছেন অভিনেতা বিজয় কেন্দ্রে।
১৯৩৪ সালের ৪ নভেম্বর গুজরাটের ভাদোদরায় বিজয়া জয়বন্ত হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব ইব্রাহিম আলকাজি ও আদি মারজবানের অধীনে নাট্যকলার তালিম নেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কেবল অসংখ্য প্রশংসিত নাটকই পরিচালনা করেননি, বরং ভারতীয় নাট্যশিল্পীদের একাধিক প্রজন্মকে গড়ে তুলেছেন। ষাটের দশকে মারাঠি নাট্যমঞ্চে তিনি এক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। নাট্যকার বিজয় তেন্ডুলকর, অভিনেতা ড. শ্রীরাম লাগু ও অরবিন্দ দেশপাণ্ডের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পরীক্ষামূলক নাট্যদল ‘রঙ্গায়ন’। এই দলটি পেশাদারিত্ব এবং গুণমানকে বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার আদর্শে পরিচালিত হতো, যা সেই সময়ে এক অভিনব প্রচেষ্টা ছিল।
পরবর্তীতে তিনি স্বতন্ত্র নির্দেশক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর পরিচালনায় মঞ্চস্থ ‘এক শূন্য বাজিরাও’, ‘ব্যারিস্টার’, ‘হামিদাবাইচি কোঠি’, ‘পুরুষ’, ‘মহাসাগর’ এবং ‘শকুন্তল’-এর মতো নাটক আজও দর্শক হৃদয়ে অম্লান। চলচ্চিত্র জগতেও তিনি তাঁর স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৮৬ সালে ‘রাও সাহেব’ এবং ১৯৮৮ সালে ‘পেস্টনজি’-র মতো ছবি পরিচালনা করে তিনি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। অভিনেত্রী হিসেবে গোবিন্দ নিহলানির ১৯৮৪ সালের ছবি ‘পার্টি’-র জন্য এশিয়া প্যাসিফিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।
তাঁর অর্জনের ঝুলিতে রয়েছে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার, সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি ঠাকুর রত্ন এবং শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব-অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেছেন, “পরিবেশন শিল্পের জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।”
বিজয়া মেহতার সান্নিধ্য যারা পেয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই আজ অশ্রুসজল। অভিনেতা অনুপম খের, যিনি ‘রাও সাহেব’ ও ‘পেস্টনজি’-তে তাঁর পরিচালনায় কাজ করেছেন, তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় এক আবেগঘন শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছেন। খের লিখেছেন, “তাঁর সঙ্গে প্রতিটি মহড়া আমাকে মনে করিয়ে দিত অভিনয় আসলে কত বিশাল এক মহাসাগর। তিনি কখনও জ্ঞান চাপিয়ে দিতেন না, বরং আলোকিত করতেন। তাঁর শৃঙ্খলার মধ্যে ছিল স্নিগ্ধতা, উষ্ণতার মধ্যে বিনয় এবং প্রতিভার মধ্যে সরলতা।”
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ইংরেজি ও গুজরাটি নাট্য অভিনেতা ফারুক মেহতার স্ত্রী এবং প্রবীণ অভিনেত্রী দুর্গা খোতের পুত্রবধূ। মৃত্যুর সময় তিনি এক কন্যা ও দুই পুত্র রেখে গেছেন। ভারতীয় নাট্যমঞ্চের এই অকাল প্রস্থান এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে গেল। সারা দেশ আজ এই মহীয়সী নারীকে অশ্রুসজল নয়নে শেষ বিদায় জানাচ্ছে।